ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৬ ১৪২৬   ২২ মুহররম ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
২০

‘সুলতান সুলেমান’ যেমন ছিলেন...

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

সুলতান সুলেমান দাপটের সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় ঠিকই ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলে ‘সুলতান সুলেমান’ নামের তুর্কি টিভি সিরিয়াল সম্প্রপ্রচার এই আলোচিত সুলতান সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে। 

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা সুলতান সুলেমান’কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আগ্রহাদ্দীপক বিবেচনায় সেই প্রতিবেদনটি এখানে উপস্থাপন করা হলো-  

 

তৈলচিত্রে সুলতান সুলেমান বা সোলিমান
  

তুরস্কে অটোমান (ওসমানীয়) সাম্রাজ্য যখন প্রতিষ্ঠিত এবং ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে তখন ষোড়শ শতাব্দীতে দশম সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন সুলতান সুলেমান খান। ১৪৯৪ সালের ৬ই নভেম্বর তিনি জন্ম নেন তুরস্কে। তার পিতা সেলিম খান (প্রথম) মারা গেলে তিনি ১৫২০ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর বিশাল রাজ্যের দায়িত্ব নেন। সুলতান সুলেমানের শাসন আমলে অটোমান সাম্রাজ্যের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি এতটা বিস্তার লাভ করে যা এশিয়া ছাড়া ইউরোপ, আফ্রিকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, রাজ কাজ পরিচালনা করার জন্য যে প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা দরকার সেটা সুলতান সুলেমানের মধ্যে ছিল।

এই জন্য পশ্চিমারা তাকে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট বা মহামতি’ বলতেন। আবার তুরস্কে তিনি ‘কানুনি সুলতান’ নামে পরিচিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতানা সুকন্যা বাশার বলছিলেন, তিনি অসম্ভব দৃঢ়চেতা একজন মানুষ ছিলেন যার নমুনা দেখা গেছে বিভিন্ন যুদ্ধে তার ভূমিকার সময়।

মিজ বাশার বলছিলেন, ‘অটোমানদের সঙ্গে যখন পার্শ্ববর্তী দেশের যুদ্ধ হয়েছে, তখন তিনি তার বাচনভঙ্গি, বক্তব্যের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মনোবল দৃঢ়চিত্ত করেছেন।’

‘যারা ইতিহাস গবেষক আমরা একজন শাসককে বিচার করি তার শাসন প্রক্রিয়া এবং কতটা মনোবল নিয়ে তিনি শত্রুদের মোকাবিলা করতে পেরেছেন, সেটা শক্তি দিয়ে হোক বা যুক্তি দিয়ে।’

‘এই দুই দিক দিয়েই সুলতান সুলেমান তার বংশের অন্যান্য শাসকদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিলেন,’ বলছিলেন তিনি।

সুলতান সুলেমানের সেনাবাহিনী রোমান সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির পতন ঘটায়। পারস্যের সাফাভিদ সুলতান, প্রথম তাহমাসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি উত্তর আফ্রিকার আলেজেরিয়াসহ বড় বড় অঞ্চলগুলো রোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে দখল করে নেন। অটোমান নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।

অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, ‘ইউরোপে সেই সময় তার সমকক্ষ কোনো শাসক ছিল না। আইন প্রণয়ন, শাসন বিধি প্রণয়ন, সামরিক সাফল্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সব মিলিয়ে তিনি ঐ সময়ের রাজন্যবর্গের মধ্যে ছিলেন অনন্য।’

প্রশাসনিক কাজ:
‘উসমানী সালতানাত: রাজনীতি সমাজ সংস্কৃতি’ বই এর লেখক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, ‘তিনি যে শুধু সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন সেটাই না, সাম্রাজ্যের সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রণালী তৈরি করেছিলেন তিনি। পরবর্তী তার উত্তরাধিকারীরা সেটা অনুসরণ করেছেন এমনকি আধুনিক তুরস্কে তার কিছু অনুসরণ করা হয়।’

‘এই কারণে সুলেমান আল কানুনি বা আইন প্রণেতা হিসেবে তাকে ডাকা হয়।’

বিশাল এলাকা তিনি কেন্দ্র থেকে অর্থাৎ আজকের ইস্তানবুল থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

প্রেমিক কবি সুলেমান:
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে উন্নয়ন ঘটেছিল তার সময়।

তার সময়কে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন ইতিহাসবিদরা। তিনি নিজে কবিতা লিখতেন। ‘মুহিব্বি’ নামে তিনি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। মুহিব্বি অর্থ প্রেমিক। তিনি প্রেম-বিষয়ক কাব্য লিখতেন। এছাড়া তার সময়ে বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে।

নামকরা স্থপতি সিনান মিনার পাশা ছিলেন তার সময়ে। যিনি সুলেমানী মসজিদ যেটা ‘ব্লু মস্ক’ নামে পরিচিত সেটা নির্মাণ করেন।

এছাড়া তোপকাপি প্রাসাদে সিনান মিনার পাশার কাজ রয়েছে। এই রকম নানা বিষয়ের মধ্যে তার প্রচণ্ড সাংস্কৃতিক মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

বিতর্ক:
সুলেমান তার শাসনকালে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন সেটা হলো ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তার কাছের মানুষদের মৃত্যুর আদেশ দেন। এর মধ্যে অনেকের কাছে মর্মান্তিক মনে হয়েছে তার ছেলে মুস্তাফার মৃত্যুর আদেশ। এবং তারপরে তার বাল্যবন্ধু এবং সাম্রাজ্যের উজির ইব্রাহীম পাশার মৃত্যু। এর পর তার ছেলে সেলিম (২য়)-কে আদেশ দেন আরেক ছেলে বায়েজিদের মৃত্যু কার্যকর করার জন্য। যার ফলে বায়েজিদকে মৃত্যুবরণ করতে হয় তার চার সন্তানের সঙ্গে। যেখানে সুলতান সুলেমানকে দেখা যায় সন্তানদের অসম্ভব ভালোবাসতে এবং বিপদে একে অপরের পাশে থাকার উপদেশ দিতে, তিনি কীভাবে এই সিদ্ধান্ত নিলেন সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় মানুষের মনে। অনেকেই তাকে ‘ক্ষমতা লিপ্সু’ মনে করেছেন।

তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতানা সুকন্যা বাশার দুইটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলছিলেন, ‘আমরা যে কোনো সম্রাটের জীবন নিয়ে যখন গবেষণা করি তখন দেখি তারা তাদের জীবনকালে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে চান না। স্বাভাবিকভাবে একজন যখন ক্ষমতা উপভোগ করা শুরু করেন, তখন তিনি চান তার জীবদ্দশায় সেই ক্ষমতা উপভোগ করবেন।’

‘একজন সুলতান যখন দেখবেন তার পুত্রের জনপ্রিয়তা তার চেয়ে বেশি এবং তার কানে যদি খবর আসতে থাকে সেই পুত্র বিদ্রোহ করতে পারেন, তাহলে তখন সেই ব্যক্তি কিন্তু বাবা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন না।’

‘তিনি সাম্রাজ্যের জন্য তখন একজন সুলতান হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন। সেটিকে তিনি দেশদ্রোহীতার শামিল মনে করেছেন। যেটা হয়েছে মুস্তাফার ক্ষেত্রে, ‘বলছিলেন তিনি। তবে অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, ‘উত্তরাধিকার নিয়ে যাতে কোনো সমস্যা তৈরি না হয় সেজন্য সুলতান সুলেমানের আগেই একটি আইন তৈরি করা ছিল। সাম্রাজ্য যাতে হুমকির মুখে না পড়ে বা স্থায়িত্ব কম না হয় সেকারণে সেই আইনটি করা হয়েছিল। ‘ভ্রাতৃহত্যা আইন’ নামে একটি বিধিবদ্ধ আইন করা হয়েছিল।

এ আইনে শুধু ‘প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইদের ও সন্তানদের হত্যা করা যেত।’

‘এই আইনটি একটি অমানবিক আইন ছিল। যেটার চর্চা সুলতান সুলেমান নিজেও করেছেন তার সাম্রাজ্যকে এবং তার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য। যেটা ইতিহাসে আছে এবং তার চরিত্রে এটা একটা অন্ধকার দিক। যেটা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক,’ বলছিলেন তিনি।

হেরেম:
ইস্তানবুলের তোপকাপি প্রাসাদে রয়েছে শত শত ঘর যেটা দাস-দাসীদের জন্য।

হেরেম সম্পর্কে রাজকীয়ভাবে জানা যায় না কারণ তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হত না। তাই তা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য আছে বলে মনে করেন গবেষকরা। তবে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী দাসীকে মুক্ত করে স্বাধীন নারী হিসেবে বিয়ে করার নিয়ম ছিল, যেটা সুলেয়মানের হেরেমে করা করা হয়েছে।

সুলেমান নিজে একজন দাসীকে মুক্ত করে বিয়ে করেন যার নাম ছিল হুররাম।

খান বলছিলেন, ‘রাজনীতিতে হুররাম এবং সুলেমানের মায়ের ভূমিকা ছিল। এবং সুলেমান নিজেই সেটা করে দিয়েছিলেন। তবে ইউরোপীয় গবেষণায় হেরেম সম্পর্কে চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখতে পাওয়া যায়।’ তিনি দীর্ঘ ৪৬ বছর রাজত্ব করেন। ১৫৬৬ সালের হাঙ্গেরি অভিযানের নেতৃত্ব দেয়ার উদ্দেশ্যে কনস্টান্টিনোপল হতে রওয়ানা হয়েছিলেন, তিনি হাঙ্গেরিতে যিগেটভারের যুদ্ধে অটোম্যান বিজয়ের পূর্বেই  ৬ই সেপ্টেম্বর মারা যান। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়ে যাবে একারণে তার মৃত্যুর তথ্য গোপন রাখা হয়।

তার মরদেহের একটি অংশ হাঙ্গেরি বিজয়ের পর সেখানে সমাহিত করা হয় এমন একটি বিতর্ক আজো চালু রয়েছে। তবে তুরস্কে সোলাইমানী মসজিদে তার কবর রয়েছে। 

সূত্র: বিবিসি

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ