ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৭

  • || ০৬ শাওয়াল ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
১৬১

সামুদ জাতি : যেখানে নেমেছিল আল্লাহর ভয়ানক গজব

আজকের ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল ২০২০  

মহান আল্লাহ যুগে যুগে বহু নবী রাসূল প্রেরণ করেছে মানুষ ও মানবতার জন্য। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে ফিরিয়ে আল্লাহর দাসত্বের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। 

আগেকার যুগে মহান আল্লাহ জনপদভিত্তিক নবী প্রেরণ করতেন। যেমন হজরত লুত (আ.)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল সাদুম নগরীর জন্য। জর্ডানের আম্মান থেকে হাযরামাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত নগরীর জন্য আল্লাহ প্রেরণ করেছিলেন হজরত হুদ (আ.)-কে। হজরত মুসা ও হারুন (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন মিশরবাসীর জন্য। হজরত ইয়াকুব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন ফিলিস্তিনের কানান নগরীর জন্য। এভাবে অনেক নবীকেই মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট এলাকার জন্য প্রেরণ করেছেন। হজরত সালেহ (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন সামুদ জাতির জন্য। আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় সালেহ (আ.) এর জাতির ওপর আল্লাহ কেন গজব নাজিল করেছিলেন, কারণ কী? এর থেকে আমাদের শিক্ষার কি আছে। 

সামুদ জাতি অতীত ইতিহাসের কালজয়ী এক জাতি। যারা শক্তি সাহস শৌর্যবীর্যে ছিল অনন্য। শিল্প ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের মতো কোনো শক্তিশালী জাতি পৃথিবীতে আগমন করেনি। তবে অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, আদ জাতির পর সামুদ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী জাতি। তাদের জীবন ও জীবিকার মান যত উন্নত ছিল আচার আচরণ ও মানবতা নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিল। তাদের বসবাস ছিল বড় বড় পাহাড়ের খোদায়কৃত বাড়িতে। তাদের বাজার ছিল পাহাড়ের চূঁড়ায়। সর্বদিকে ছিল দম্ভ আর অহঙ্কারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ছিল সামুদ জাতি। কুফর শিরক অবাধ্যতায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল সামুদ জাতির প্রতিটি মানুষ। মিথ্যা অহমিকায় আল্লাহকে অস্বীকার করতেও দ্বিধাবোধ করলো না এই জাতি। তাদের যখন এই অবস্থা তখন তাদের কাছে আল্লাহ প্রেরণ করলেন হজরত সালেহ (আ.)-কে।  সেই কথা আল্লাহ কোরআনুল কারিমে উল্লেখ করছেন,

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ فَإِذَا هُمْ فَرِيقَانِ يَخْتَصِمُونَ

অর্থ : ‘আমি অবশ্যই সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে প্রেরণ করেছি। (সে তাদেরকে বললো) তারা যেন এক আল্লাহর ইবাদত করে। অথচ তাদের দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়লো।’ (সূরাতুল নামল: আয়াত নম্বর: ৪৫)।

এই কথাটাই কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
 
وَوَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ

অর্থ : ‘এমনভাবে আমি সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে প্রেরণ করলাম। (সে তাদেরকে বললো) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো; তার সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরাতুল আরাফ : আয়াত নম্বর: ৬১)।

হজরত সালেহ (আ.) তাদেরকে আল্লাহর একাত্ববাদের দাওয়াত দিতেন। তারা তা অস্বীকার করলো। এমন কি তারা তার নবুয়াতিকেও অস্বীকার করলো। তারা বলতো তুমি কি আমাদেরকে আমাদের বাপদাদার ধর্ম ছেড়ে দেয়ার দাওয়াত দিচ্ছো? আমরা কখনোই তোমার দাওয়াত গ্রহণ করবো না।
 
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ هُوَ أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُجِيبٌ  قَالُوا يَا صَالِحُ قَدْ كُنْتَ فِينَا مَرْجُوًّا قَبْلَ هَذَا أَتَنْهَانَا أَنْ نَعْبُدَ مَا يَعْبُدُ آَبَاؤُنَا وَإِنَّنَا لَفِي شَكٍّ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ مُرِيبٍ

অর্থ : ‘আর সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে প্রেরণ করি; তিনি বললেন, হে আমার জাতি! আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নাই। তিনিই জমিন হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চল। আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন; সন্দেহ নেই। তারা বলল, হে সালেহ! ইতিপূর্বে তোমার কাছে আমাদের বড় আশা ছিল। আমাদের বাপ-দাদা যা পূজা করতো তুমি কি আমাদেরকে তার পূজা করতে নিষেধ কর? কিন্তু যার প্রতি তুমি আমাদের আহ্বান জানাচ্ছো আমাদের তাতে এমন সন্দেহ রয়েছে যে, মন মোটেই সায় দিচ্ছে না।’

অনত্রে তাদের অবাধ্যতার বর্ণনা এভাবে আল্লাহ তুলে ধরেছেন,

كَذَّبَتْ ثَمُودُ الْمُرْسَلِينَ  إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُونَ  إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ  فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ  وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থ : ‘সামুদ সম্প্রদায় পয়গম্বরদেরকে (হজরত সালেহ (আ.) কে) মিথ্যাবাদী বলেছে। যখন তাদের ভাই সালেহ, তাদেরকে বললেন, তোমরা কি ভয় কর না? আমি তোমাদের বিশ্বস্ত নবী। অতএব, আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি এর জন্যে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্বপালনকর্তাই দেবেন।’

وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَى عَلَى الْهُدَى فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُونِ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ  وَنَجَّيْنَا الَّذِينَ آَمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ  

অর্থ : ‘আর যারা সামুদ, আমি তাদেরকে প্রদর্শন করেছিলাম, অতঃপর তারা সৎপথের পরিবর্তে অন্ধ থাকাই পছন্দ করল। অতঃপর তাদের কৃতকর্মেও কারণে তাদেরকে অবমাননাকর আজাবের বিপদ এসে ধৃত করল। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল ও সাবধানে চলতো, আমি তাদেরকে উদ্ধার করলাম। সূরাতুল হামি সাজদাহ : আয়াত নম্বর: ১৮)।

এভাবে হজরত সালেহ (আ.) সারা জীবন তাদের অস্বীকারের পরও তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে অল্প কিছু সঙ্গী ছাড়া গোটা জাতি তার অবাধ্যই থেকে যায়। একপর্যায়ে তারা দাবি করে, আপনি যদি সত্যি নবী হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উটনী বের করে দেখান। এটি দেখাতে পারলে আমরা আপনার ওপর ঈমান আনব। হজরত সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর কুদরতে পাহাড় থেকে একটি অদ্ভুত রকমের উটনী বের হয়। তা দেখে কিছু লোক ঈমান আনে। কিন্তু তাদের সর্দাররা ঈমান আনেনি, বরং তারা সে উটনীকে হত্যা করে ফেলে। এতে সালেহ (আ.) তার জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসার ঘোষণা দেন। তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে তিনদিন পরই আল্লাহর আজাব তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।

قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ هَذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللَّهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ 

অর্থ : ‘(হযরত সামুদ সালেহ আ. বললো) তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি প্রমাণ (উটনী) এসে গেছে। এটি আল্লাহর উটনী তোমাদের জন্যে প্রমাণ। অতএব, একে ছেড়ে দাও, আল্লাহর ভূমিতে চড়ে বেড়াবে। একে অসৎভাবে স্পর্শ করবে না। অন্যথায় তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পাকড়াও করবে।’ (সূরাতুল আরাফ : আয়াত নম্বর: ৭৩)।

এই সতর্কতার পরও আল্লাহর উটনীকে তারা মন্দভাবে স্পর্শ করলো অতঃপর আল্লাহ তাদের ওপর গজব নাজিল করলেন। 

وَيَا قَوْمِ هَذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آَيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللَّهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ قَرِيبٌ  فَعَقَرُوهَا فَقَالَ تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ ذَلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٍ  فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا صَالِحًا وَالَّذِينَ آَمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِنَّا وَمِنْ خِزْيِ يَوْمِئِذٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ  وَأَخَذَ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دِيَارِهِمْ جَاثِمِينَ  كَأَنْ لَمْ يَغْنَوْا فِيهَا أَلَا إِنَّ ثَمُودَ كَفَرُوا رَبَّهُمْ أَلَا بُعْدًا لِثَمُودَ  

অর্থ : ‘আর হে আমার জাতি! আল্লাহর এ উটনীটি তোমাদের জন্য নিদর্শন! অতএব, তাকে আল্লাহর জমিনে বিচরণ করে খেতে দাও এবং তাকে মন্দভাবে স্পর্শও করবে না। নতুবা অতি সত্বর তোমাদেরকে আজাব পাকড়াও করবে। তবুও তারা উটনীর পা কেটে দিল। তখন সালেহ বললেন, তোমরা নিজেদের গৃহে তিনদিন উপভোগ করে নাও। ইহা এমন ওয়াদা যা মিথ্যা হবে না।’

অতঃপর আমার আজাব যখন উপস্থিত হলো, তখন আমি সালেহকে ও তদীয় সঙ্গী ঈমানদারদেরকে নিজ রহমতে উদ্ধার করি, এবং সেদিনকার অপমান হতে রক্ষা করি। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তা তিনি সর্বশক্তিমান পরাক্রমশালী। আর ভয়ঙ্কর গর্জন পাপিষ্ঠদের পাকড়াও করলো, ফলে ভোর হতে না হতেই তারা নিজ নিজ গৃহসমূহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। যেন তারা কোনদিনই সেখানে ছিল না। জেনে রাখ, নিশ্চয় সামুদ জাতি তাদের পালনকর্তার প্রতি অস্বীকার করেছিল। আরো শুনে রাখ, সামুদ জাতির জন্য অভিশাপ রয়েছে।

ইসলামী ইতিহাসবিদরা লেখেন যে, আল্লাহ সামুদ জাতিকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছেন যে তার কোনো চিহ্ন বা অস্তিত্ব পৃথিবীতে বেঁচে নেই। আল্লাহ জিবরাইলের মাধ্যমে বিশাল একটি আওয়াজ দিলেন। এই আওয়াজে পুরো সামুদ জাতি ধ্বংস হয়ে গেল। এখান থেকে আমাদের কী শিক্ষা? সামুদ জাতির ঘটনা ও তাদের উপর আল্লাহর গজব থেকে আমাদের শিক্ষা হলো আল্লাহর নিদর্শনকে কখনো অপমান বা হেয় করা যাবে না। যদি কোনো জাতি আল্লাহর নিদর্শন বা আলামতকে হেয় করে বা অপমান করে আল্লাহ এটা সহ্য করেন না। বর্তমান দুনিয়ার আল্লাহর লাখো লাখো নিদর্শনকে অপমান করা হচ্ছে। এমন কি স্বয়ং আল্লাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে অপমান করছে অগণিত মানুষ। 

ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরিকল্পিতভাবে অপমান করা হচ্ছে। এমনকি তার ইতিহাস চরিত্রকে হেয় করে নাটক ছবি প্রবন্ধ নিবন্ধ রচনা হচ্ছে। কোরআনকে অপমান করছে ধর্মহীন কিছু লোক। নাস্তিক ভাবাপন্ন কিছু মানুষ ইসলামের বিধানকে অপমান ও হেয় করছে। হয়তো বলা যায় না, এর কারণেও আমাদের ওপর গজব নেমে আসতে পারে। তাই প্রতিজন মানুষের ওপর ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা। এমন বিষয় কথা না বলা যেগুলো আল্লাহ রাসূল কোরআন হাদিস ও ইসলাম অপমানিত হয়। আল্লাহ! আমাদেরকে সামুদ জাতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।  

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর