ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

শনিবার   ২৫ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১২ ১৪২৬   ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
৫৩

ময়মনসিংহের হাতেম তায়ী কোরিয়ান স্যার

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি ২০২০  

দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক ইউন ইয়ন সাব ঠিক করলেন বিশ্বের কোন একটি গরীব দেশে যাবেন। ১৯৯৮ সালে আসেন বাংলাদেশে। সঙ্গে ছিলো কৃষি ও পশুপালনের উপর কাজের ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা। উদ্দেশ্য ছিলো, এদেশের গরীব মানুষের জীবন ব্যবস্থা উন্নতি করা। 

শুরুতে কুমিল্লা জেলায় জমি কিনতে ব্যর্থ হয়ে চলে আসেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভেবেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু এখানেও ব্যর্থ হয়ে চলে আসেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার ঘোঘা গ্রামে।

এই গ্রামে ৬ একরের অধিক জমি দিয়ে শুরু করেন কৃষি কাজ। শুরু থেকেই চেয়েছিলেন নিরাপদ জৈবিক উপায়ে চাষাবাদ ও পশুপালন করতে। দীর্ঘ ২১ বছর অবধি তার ‘সেহা বাংলাদেশ’ নামের খামারে এ পদ্ধতিতেই চাষাবাদ করে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। 

কয়েক বছর আগে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণের কারণে মহামারি আকারে রোগ বালাই ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন থেকে জীবের নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিষেধ করা হয়। এদিকে জৈবিক পদ্ধতি মেনে চলায় তার উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় তার ক্রেতা হন বাংলাদেশে অবস্থানরত কোরিয়ান নাগরিকরা। তাদের কাছে সেগুলো বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেন। বছরে ভালো অঙ্কের টাকা পান তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে। বর্তমানে নিরাপদ খাদ্যে পণ্যগুলো কিনছেন বাংলাদেশিরাও। এখান থেকে উপার্জিত অর্থ খরচ করেন তার গ্রামের মানুষের জন্য। 

সরজমিনে দেখা গেছে, কোরিয়ান এই নাগরিক প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রায় ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে স্কুল ও কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই স্কুলে নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়তে পারে গ্রামের সবাই। শিক্ষার্থীদেরকে টিফিন হিসেবে দেয়া হয় রুটিন মাফিক ফার্মে উৎপাদিত দুধ, ডিম, কলাসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও সবজি। যে কেউ চাইলেও কৃষি প্রশিক্ষণ সেন্টারে নিতে পারেন বিনামূল্যে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এছাড়াও তিনি এলাকায় স্থাপন করেছেন প্রায় ১২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৪০ টির অধিক বিশুদ্ধ খাবার পানির নলকূপ, কৃষকদের সেচ সুবিধার্থে ফসলের মাঠে  প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বসিয়েছেন গভীর নলকূপ, ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ টির অধিক স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, ৪০টির অধিক টিনের ঘর বানিয়ে দিয়েছেন, ২০টির অধিক বাড়িতে গোছলখানা বানিয়ে দিয়েছেন। এলাকার মানুষের জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা।

তার বৈচিত্র্যময় ফসলের খামারে টাকার পাতা খ্যাত ক্যাননিব, কোরিয়ান সবজি বেচ্চু, মু, সিকুরী, আওতারি বিচিত্র ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি গড়ে তুলছেন পোল্ট্রি এবং ডেইরি ফার্ম। গরু ও ছাগলের খামার থেকে উৎপাদিত দুধ পাস্তুরিত করে গ্রামের মানুষদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছেন। গবাদী পশুর খামারে কাজ করেন সুদীপ্ত চন্দ্র দাস। 

তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই খামারে বাইরে থেকে সরবরাহকৃত কোনো পশুখাদ্য ব্যবহার করা হয় না। নিজেরাই এ খাদ্যগুলো বানিয়ে তা খামারে ব্যবহার করা হয়। কৃষি জমিতে গবাদী পশুর মলমূত্র সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও এখানে পুকুরে মাছ উৎপাদন করেন কোরিয়ান নাগরিক। কয়েক সপ্তাহ আগেও ৫০০ কেজি মাছ ধরে গ্রামের মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন তিনি। সদালাপী, মিশুক, পরিশ্রমী, পরোপকারী এবং বহু গুণে গুণান্বিত এই মানুষটা নিজেকে এলাকার মানুষের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছেন বাংলা ভাষা। 

এসব জনসেবা করার কারণে এলাকার ‘হাতেম তায়ী’ খ্যাতি পেয়ে গেছেন তিনি। গ্রামের সবাই তাকে কোরিয়ান স্যার বলেই চিনেন ও এই নামেই ডাকেন। তার গ্রামের বাসিন্দারাও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পরিবার পরিজন ছেড়ে অজো পাড়া গায়ে অবস্থান করছেন সস্ত্রীক। নিজের কোন ব্যক্তিগত গাড়িও নেই। খামারের পণ্য পরিবহনের গাড়িতে করে চলাচল করেন। ঢাকায় কিংবা দূরের ভ্রমণে ব্যবহার করেন লোকাল বাস। 

খামারের ম্যানেজার শুক্কুর আলী বলেন, এখানে বেতনভুক্ত কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৩০ জন। এদের প্রত্যেকেই বেশ মোটা অংকের বেতন পান। বছরে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৫ বার পর্যন্ত বোনাস দেন যাতে সবাই জীবন মানের উন্নতি করতে পারেন। 

স্কুলের কোচিং এ পার্টটাইম চাকরি করেন অনার্সে পড়ুয়া রাকিব হোসেন নামের একজন। তিনি জানান, দিনে মাত্র ৩ ঘণ্টা সময় দেয়ার বিনিময়ে ডিসেম্বর মাসে তিনি ১৩ হাজার টাকা বেতন পেয়েছেন। কোরিয়ান নাগরিক নিজেই জানিয়েছেন ম্যানেজারকে বেতন দেন ৫০ হাজারের অধিক। 

তার সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে কথা হয় পাশ্ববর্তী ৯ নং কাশিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হকের সঙ্গে। 

তিনি জানান, কোরিয়ান এই নাগরিক তার কৃষি খামারে উৎপাদিত পণ্য ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন। পাশাপাশি তিনি অত্র এলাকার অনেক অনেক গরীব মানুষ তার খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে সাবলম্বী হয়েছে। এলাকার অনেক মানুষকে তিনি ঘর, টিউবওয়েল দিয়েছেন। এলাকার মানুষ জনকে নিয়ে তিনি প্রায়শই তার নিজ খরচে ভ্রমণে নিয়ে যান। কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কিংবা খিস্ট্রান ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য তিনি এসব সাহায্য করেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়া ফাইম ইকবাল নামের আরেকজন বাসিন্ধা বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই দেখছি তিনি এলাকার মানুষের জন্য অনেক ভালো ভালো কাজ করেন।  অনেকে মনে করেন, খিস্ট্রান ধর্মে গ্রহণ করার বিনিময়ে তিনি হয়ত এ কাজগুলো করছেন, কিন্তু এটি তাদের ভ্রান্ত ধারণা। 

পেশায় ভ্যান চালক এ গ্রামেরই বাসিন্ধা শামছুল হুদা বলেন, কোরিয়ান এই লোক খুবই ভালো। গ্রামের উন্নয়নে তার অবদান অনেক। তিনি কখনই বিদেশিদের মত আচরণ করেন না, তিনি যেন আমাদের গ্রামেরই বাসিন্ধা সেভাবেই সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকেন। 

এদেশে আসার বিষয়টি জানতে চাইলে ইউন ইয়ন সাব জানান, নিজ দেশে তিনি ছিলেন একজন সফল খামারি। গত শতাব্দীর শেষ দশকে বিশ্বের দারিদ্রপীড়িত ৮০টি দেশের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশকে বেছে নেন তার কাজ করার ক্ষেত্র হিসেবে। প্রথমে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন, চেয়েছিলেন পাঁচ বছর পর নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের টানে আর ঘরে (নিজ দেশে) ফেরা হয়নি তার। তার কাজের ক্ষেত্র হিসেবে ময়মনসিংহ অঞ্চলকে বেছে নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে আছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ভেবেছিলেন সহায়তা পাবেন কিন্তু তা পাওয়া হয়নি। শুরুর দিকে এলাকার লোকজন না বোঝে অনেকভাবে অত্যাচার করত। কিন্তু তারাই এখন আমার অনেক কাছের মানুষ হয়ে গেছে। আমার বয়স ৬৪ পেরিয়ে গেছে, গত বছরই ভেবেছিলাম দেশে গিয়ে একটু অবসর নিবো কিন্তু মায়ার টানে যেতে পারিনি। একদিন এই এলাকার মানুষের কোন কষ্ট থাকবে না, ঘোঘা গ্রামটি বাংলাদেশের মধ্যে ধনীদের গ্রাম হিসাবে পরিচিত পাবে সেই প্রত্যাশা করি।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ
এই বিভাগের আরো খবর