ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • শুক্রবার   ১০ এপ্রিল ২০২০ ||

  • চৈত্র ২৬ ১৪২৬

  • || ১৬ শা'বান ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
৪১

ভারতের একমাত্র জিন জাদুঘর

আজকের ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামীদামি বিজ্ঞানীদের মগজাস্ত্রে ধার দেয়ার জায়গা একটি ছোট্ট পাব ‘ঈগল’। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকেরও আসা-যাওয়া ছিল। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতো ক্ষুরধার আলোচনা। লোকে বলত ‘থিঙ্কিং ইন’। 

ওই দুই বিজ্ঞানি তখন কেমব্রিজের ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করছেন। পাবে বসে কতগুলো তার পেঁচিয়ে কিছু বানানোর চেষ্টা করতেন তারা। ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎই একদিন ঘোষণা করলেন, এই ঈগল পাবে বসে তারা ‘জীবন-রহস্য’ উন্মোচন করে ফেলেছেন। ওই বছরই ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘নেচার’ তাদের গবেষণাপত্রটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাই দিনটিকে এখন ‘ডিএনএ ডে’ হিসেবে পালন করা হয়। 

আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের জন্য ওয়াটসন এবং ক্রিকের সঙ্গে উইলকিন্সও নোবেল পান। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিন ততোদিনে মারা গিয়েছেন। উইলকিন্স ও ফ্র্যাঙ্কলিনকে সে ভাবে মনেও রাখেনি ইতিহাস। তবে ওয়াটসনদের তৈরি ডিএনএ মডেলটি এখনও রাখা আছে ‘ঈগল’-এ। আর তার একটি প্রতিলিপি রাখা আছে নদিয়ার কল্যাণীতে দেশের এক মাত্র জিন মিউজ়িয়ামে। কল্যাণীর জিন বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জিনোমিক্স’ (এনআইবিএমজি)-এ রয়েছে এই প্রদর্শনীশালা। নাম ‘দ্য হিউম্যান জিনোম হল’। এনআইবিএমজি ও ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব সায়েন্স মিউজিয়াম’-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয় এটি। 

প্রতিষ্ঠানের মূল দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেই স্বাগত জানাচ্ছে প্রকাণ্ড এক ডাবল হেলিক্স স্কাল্পচার। ডান দিকে একটু এগোলেই জিনোম হল বা প্রদর্শনীশালা। তার সামনে এক টুকরো সবুজ। ঘাসের উপরে একটা সিমেন্টের বেদিতে বসে আছেন সহাস্য ওয়াটসন ও ক্রিক। বয়সকালে তখন দুজনে আলাদা আলাদা শহরে থাকতেন। এক বার নিউ ইয়র্কের কাছে কোল্ড স্প্রিং হারবারে দেখা হয় দুজনের। পার্কে দুজনের পাশাপাশি বসে তোলা একটি ছবি আছে। সেটির আদলেই জিনোম হলের সামনে রাখা ওয়াটসন ও ক্রিকের মূর্তি দু’টি তৈরি করা হয়েছিল। পাশেই রাখা তাঁদের তৈরি ডিএন ডাবল হেলিক্সের মডেলটির প্রতিলিপি। 

 

 

২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রদর্শনীশালার উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হ্যারল্ড এলিয়ট ভার্মাস। রেট্রোভাইরাল অঙ্কোজিনের (এক ধরনের আরএনএ ভাইরাস, যা তার জিনোম অতিথি-কোষের ডিএনএ-তে ঢুকিয়ে দিয়ে সে কোষের চরিত্র বদলে দেয়) উৎস আবিষ্কার করার জন্য তিনি ও বিজ্ঞানী জে মাইকেল বিশপ ১৯৮৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান। 

এনআইবিএমজি-র প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী পার্থপ্রতিম মজুমদার জানান, ছোটদের মধ্যে জেনেটিক্স-এ উৎসাহ বাড়াতেই এই কর্মকাণ্ড। তাঁর কথায়, ‘‘দেশে বিজ্ঞানচর্চা বাড়লেও জিন নিয়ে গবেষণা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। দেশে জিন-গবেষণায় অগ্রগতির জন্য তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উৎসাহ বাড়াতে হবে। সে কথা মাথায় রেখেই এই প্রদর্শনীশালা তৈরি।’’ তবে এ রকম কিছু যে করা যায়, সেই পরিকল্পনাটা পার্থপ্রতিমবাবুর মাথায় আসে আমেরিকার স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে হিউম্যান জেনেটিক্স বিষয়ক একটি প্রদর্শনী দেখার পরে। সেটি তৈরি করেছেন আমেরিকার ‘ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর ডিরেক্টর এরিক গ্রিন। পরে তিনি এনআইবিএমজি-র জিনোম হলটি ঘুরে দেখেন। বলেছিলেন, ‘‘আমার প্রদর্শনীশালার থেকেও বেশি সুন্দর হয়েছে তোমাদেরটা।’’ প্রতিষ্ঠানের অতিথিদের জন্য রাখা বিশেষ নোটবুকে লিখে গিয়েছেন, ‘স্পেকটাকিউলার’।

জিনোম হলের মূল দরজা খুলতেই নানা আয়োজন। প্রথমেই জিনতত্ত্বের গোড়ার কথা। ডিএনএ কী, তার আকার কেমন, জেনেটিক ম্যাপিং, ক্রোমোজ়োমের অস্বাভাবিকতা থাকলে কী হয়, এমন সব খুঁটিনাটি প্রশ্নের উত্তর। নির্দিষ্ট বোতাম টিপলেই পর্দায় ভেসে উঠছে জবাব। ১৯ মিনিটের একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিতে দেখানো মানবসভ্যতার গোড়ার কথা ও মানুষের বিবর্তন।

অভিনব পদ্ধতিতে দেখানো হয়েছে, জিন-চরিত্রের পরিবর্তনে কী ভাবে বদলে যায় ত্বকের রং। ব্যাপারটা খানিকটা এ রকম, গায়ের চামড়া সাদা না কালো হবে, তার জন্য দায়ী অন্তত ১২০টি জিন। প্রদর্শনীতে হাতেকলমে দেখানো হয়েছে এই বিষয়টি। যন্ত্রের পর্দায় ভেসে উঠছে একটি মেয়ের ছবি। বিশেষ কি-বোর্ডের সাহায্যে থ্রিয়োনাইনকে বদলে অ্যালানিন করে দিলেই শ্বেতাঙ্গ মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে উঠছে। 

প্রত্যেক আবিষ্কারের আড়ালে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস। প্রদর্শনীশালার আনাচেকানাচে রয়েছে তার ছোঁয়াও। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা করছিলেন জিন-বিশেষজ্ঞ অ্যালেক জেফ্রিস। গবেষণার বিষয় ছিল, একই পরিবারে কী ভাবে কোনও অসুখ বয়ে চলে। তাঁর সেই গবেষণাটি ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন তিনি— ‘ডিএনএ ফিংগারপ্রিন্টিং’। মানবকোষ থেকে ডিএনএ নিয়ে তা ফোটোগ্রাফিক ফিল্মে জুড়ে দিয়েছিলেন জেফ্রিস। ফিল্মে কিছু ‘ব্যান্ড’ ভেসে ওঠে। জেফ্রিস টের পান, এ ভাবে যাঁর যাঁর দেহকোষ নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেছিলেন তিনি, প্রত্যেককে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। জেফ্রিস প্রথম যখন এক বিজ্ঞানসভায় তাঁর আবিষ্কারের কথা বলেছিলেন, অনেকে শুনে হাসেন। কিন্তু পরে তিনিই হয়ে ওঠেন ‘ফাদার অব ডিএনএ ফিংগারপ্রিন্টিং’। তার গবেষণার সাহায্যেই ব্রিটেনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বহু শিশুর পিতৃপরিচয় নির্ধারণ করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার সাহায্যে খুনের মামলায় ধরা হয় অপরাধীকেও।

অ্যালেক জেফ্রিসের পাশাপাশি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের (হরগোবিন্দ খুরানা, প্রশান্ত মহলানবিশ, ডি ডি কোশাম্বি, এল ডি সাঙ্ঘভি) কৃতিত্বকেও সম্মান জানানো হয়েছে জিনোম হলে। আবার, ক্যানসারের মতো মারণ রোগ ও তার পিছনে জিনের কারসাজি কতটা, এ নিয়ে হ্যারল্ড ভার্মাস-এর মতো বিজ্ঞানীদের ভাবনাচিন্তাও স্থান পেয়েছে। জিনের সামান্যতম ‘খামখেয়ালিপনায়’ কী হতে পারে (ডাউন সিনড্রোম, প্রেডার উইলি সিনড্রোম, লিউকেমিয়া), ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা। এছাড়াও প্রদর্শনীতে আলো ফেলা হয়েছে সেই ভবিষ্যতের গবেষণায়। যেমন, ‘জিন-এডিটিং’। 

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ওয়াটসনদের জিন-রহস্য উন্মোচনের ৬৭ বছর পূর্ণ হল। পার্থপ্রতিম মজুমদার জানান, ওয়াটসন ও ক্রিক যে জীবন-রহস্য উন্মোচন করেছিলেন, সেই ধাঁধারই পরের সূত্র আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়ার স্বপ্ন দেখছি আমরা।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ
ইত্যাদি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর