ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০ ||

  • চৈত্র ২২ ১৪২৬

  • || ১১ শা'বান ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
২৩২

ব্যাঙ হত্যা আর নয়

আজকের ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২০  

‘একটি ব্যাঙ। একদিন পাথরের কোটরের মধ্যে ঢুকেছিল। সেখানেই টিকে ছিল তিন হাজার বছর। কীভাবে টিকে থাকতে হয় ব্যাঙ তা জানে। অস্তিত্ত্ব রক্ষায় পাথরের আড়াল থেকে মুক্ত করা হয় ব্যাঙকে।’ রবীন্দ্রনাথ তার রক্তকরবী নাটকে ব্যাঙের পরিচয় এভাবেই দিয়েছিলেন। 

একটি ব্যাঙ কীভাবে খারাপ পরিস্থিতেও পৃথিবীর পরিবেশ টিকে থাকে সেই বর্ণনাটিই দেয়া আছে রবীন্দ্রনাথের নাটকে। মানব হৃদয়ের গভীরের আনন্দকে ব্যাঙের ‘ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন ব্রিটিশ কবি আরথার সায়মন্স। তার ‘দ্য অ্যাকসটেসি’ কবিতায় তারই প্রকাশ মিলেছে। তিনিও ব্যাঙ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মতোই অনুভব করেছেন। ভাবছেন ব্যাঙ নিয়ে এতো কথা বলার কি আছে? ব্যাঙ ছাড়া যে পৃথিবীর পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ব্যাঙ হত্যা যে মহাপাপ! ইসলামেও এই প্রাণীটি হত্যা সম্পর্কে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। আর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ব্যাঙ মানবজাতির জন্য এক আশির্বাদস্বরুপ।

 

লাল ও সবুজ রঙের ব্যাঙ

লাল ও সবুজ রঙের ব্যাঙ

ব্যাঙ উভচর শ্রেণীর অ্যানিউরা বর্গের মেরুদণ্ডী প্রাণী। দীর্ঘ লাফ দেয়ার ক্ষমতা ও বর্ষাকালে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাকই তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ব্যাঙের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে কিছু প্রজাতি নিশাচর আবার কিছু শীতল রক্তবিশিষ্ট। বিজ্ঞানের যে শাখায় উভচর এবং সরিসৃপ প্রাণীদের নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে হারপেটোলজি বলে। আর এসব প্রাণীদের নিয়ে কাজ করেন এমন বিজ্ঞানীদের বলা হয় হারপেটোলজিস্ট।

 

ব্যাঙের শরীরের আকৃতি

যেকোনো পরিবেশে খুব দ্রুত চলা, শিকার ধরা, শিকারীর কাছ থেকে পালানো, এবং অভিযোজনের জন্য ব্যাঙের পা ও পায়ের পাতা বিশেষ গঠনের হয়। আর এ গঠন সাধারণত এদের ডাঙ্গা, পানি, বা বৃক্ষে বাস করার উপর নির্ভর করে হয়ে থাকে। ব্যাঙ সাধারণত তাদের গায়ের চামড়া ব্যবহার করে শরীরে বাতাস প্রবেশের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসে কাজটি সম্পন্ন করে। শ্বাসযন্ত্রের কাজ ছাড়াও এদের গায়ের চামড়া পানি শোষণ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও গায়ের প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। এর গায়ে অনেক গ্রন্থি রয়েছে। বিশেষ করে মাথার উপরে ও পেছনে। যা প্রায়ই অপ্রীতিকর এবং বিষাক্ত পদার্থ ছড়ায়।

 

কোলা ব্যাঙ

কোলা ব্যাঙ

ব্যাঙ পরিবেশের জন্য যে উপকার করে

 

অর্থনৈতিকভাবে ব্যাঙ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাঙ সহায়তা করে। ফসলের পোকা মাকড় খেয়ে ফসলের সুরক্ষা করে ব্যাঙ। ফলে জমিতে অতিরিক্ত কিটনাশক দিতে হয়না। তাই জমির উর্বরতা ঠিক থাকে। ফসলের ফলন বাড়ে।

বাংলাদেশে ব্যাঙের প্রজাতি সংখ্যা মাত্র ৬৩টি। সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৭৪০ প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮০ সালের পর প্রায় দুইশ’ প্রজাতির ব্যাঙ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পানি অথবা স্থল- উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাঙের অবাধ বিচরণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

ব্যাঙের মাংসের চাহিদা বিশ্বজুড়েই

ব্যাঙের মাংসের চাহিদা বিশ্বজুড়েই

মানুষের খাদ্য হিসেবে

বহুযুগ ধরেই মানুষ ব্যাঙকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে আসছে। ব্যাঙের মাংস খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাঙ একটি উপাদেয় খাদ্য। যেমন- ফ্রান্সের মানুষের কাছে ব্যাঙের পা খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার।

প্রকৃতির খাদ্যপ্রবাহে ভূমিকা

সাধারণত ব্যাঙ প্রকৃতির খাদ্যপ্রবাহের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে। ব্যাঙ বিভিন্ন রকমের পোকামাকড় খায়, আবার ব্যাঙকে খায় সাপ, পাখি, এমনকি মানুষও। বড় বড় পোকামাকড় ও বিভিন্ন জটিল রোগ ছড়ায় এমন পোকামাকড় এরা খায়, বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার বিস্তার ঘটায় এমন মশাও খেয়ে ফেলে।

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেয় ব্যাঙ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেয় ব্যাঙ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস

প্রকৃতির সঙ্গে ব্যাঙের নিবিড় সম্পর্কের ফলে পরিবেশ সম্পর্কে এরা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। পরিবেশের অনেক পরিবর্তন আগে থেকে আঁচ করতে পারে তারা। এজন্য ব্যাঙকে কয়লাখনির খুদে গায়কপাখি (ক্যানারিজ ইন দ্য কোলমাইন) নামে ডাকা হয়। যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ ড. রাসেল গ্রান্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একপ্রকার কুনো ব্যাঙ সাধারণত ভূমিকম্পের কমপক্ষে সপ্তাহ খানেক আগে নিজের ঘর ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয় নেয়।

চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যাঙের গুরুত্ব

ব্যাঙের শরীর থেকে যে রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায় তা মানুষের অনেক জটিল রোগ সারায়। আবার কয়েকটি ব্যাঙের জাতের দেহ থেকে এক প্রকার বিষ পাওয়ায় যায়। যা মানুষ বহুবছর ধরে তীরের ফলায় বিভিন্ন প্রাণী শিকার কাজে বৃবহৃত হচ্ছে। ১৯৫০ সালের দিকে নারীর গর্ভধারণ পরীক্ষার জন্য আফ্রিকার এক ধরনের ব্যাঙের দেহের কাইট্রিড নামক ছত্রাক ব্যবহার করত।

 

চিকিৎসায় ব্যাঙ ব্যবহারের রীতি বেশ পুরনো

চিকিৎসায় ব্যাঙ ব্যবহারের রীতি বেশ পুরনো

তবে ইসলামে ব্যাঙ হত্যা সম্পর্কে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেসব ব্যাঙ পানি ছাড়া বাঁচে না সেগুলোও খাওয়া হারাম কেননা হাদিসে ব্যাঙ হত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এ বিষয়ে হাদিস হলো- আব্দুর রহমান ইবনে উসমান রা. থেকে বর্ণিত: ‘কোনো চিকিৎসক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি’ ওয়া সাল্লামকে ব্যাঙ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, এটা ঔষধে প্রয়োগ করবেন কি না? তিনি ব্যাঙ হত্যা করতে নিষেধ করলেন।’ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সঃ) চার প্রকার প্রাণী হত্যা করতে বারণ করেছেন-পিঁপড়া, মধুমক্ষিকা, হুদহুদ পাখি এবং চড়ুইসদৃশ বাজপাখি। (আবু দাউদ, হাদিস: ৫২৬৭)

বর্তমানে বিশ্বে ব্যাঙের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার প্রজাতির মধ্যে ২০০ এরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিলুপ্ত হয়েছে ব্যাঙ। ব্রিটিশ পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন আগামী বিশ বছরের মধ্যে অন্তত দুই হাজার প্রজাতির ব্যাঙ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। উভচর এই প্রাণী রক্ষায় ১০ বছর পূর্বে ব্রিটেনের একদল গবেষক ব্যাঙশুমারি করেন। কত ব্যাঙ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে সেই হিসাব বের করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যান তারা। অতঃপর এক পর্যায়ে শুমারি বন্ধ করে দেন তারা।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ
ইত্যাদি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর