ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৮ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
৮৪৯

পোকামাকড় সংগ্রহের নেশা থেকে ‘পকেমন’

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ জুন ২০১৯  

মানুষের কতো ধরনের বিচিত্র শখ থাকে। জাপানের একটি ছোট্ট গ্রামের ছোট্ট শিশু সাতোশিরও একটি বিচিত্র শখ ছিলো পোকামাকড় সংগ্রহ। সে সকাল বিকাল এদিক সেদিক ঘুরে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় সংগ্রহ করে জারে রেখে দিতো। এই সাতোশির কথা শুনে আপনার মাথায় আরেক সাতশির কথা আসতেই পারে। সেই ছোটবেলায় দেখা পকেমনের সাতশি। যাকে আমরা বেশিরভাগই এশ নামে চিনি। কাহিনি সেই এশকে নিয়েই। মানে সাতোশিকে নিয়েই। এই সাতোশি পকেমনের সাতোশিই। কিন্তু গেইম বা এনিমের ভেতরের না। বাইরের জন, যিনি পকেমন গেইমটি বানিয়েছেন। যার গেইম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বার খেলা গেইমের একটি। কীভাবে এলো এই গেইম, কে তিনি, কীভাবে এই আইডিয়া পেলেন সে সম্পর্কেই লিখবো আজ-

তার পুরো নাম সাতোশি তাইজিরি। জন্ম ১৯৬৫ সালে। ছোটোবেলায় পড়াশোনায় খুব কাচা ছিলেন। মনোযোগ ছিলোই না বলতে গেলে। পরবর্তীতে তার এসপারজাস সিন্ড্রোম ধরা পরে যেটি কিনা একধরনের ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। এই ডিজঅর্ডারের বাচ্চাদের সমাজে মিশতে এবং যোগাযোগে সমস্যা হয়। কিন্তু সাতোশির শিক্ষক মনে করতেন এসব কিছুনা। ছেলে দুষ্ট। সাতোশি ভিডিও গেইম খেলতে পছন্দ করতেন। দোকানে গিয়ে পয়সা দিয়ে প্রত্যেক দিন গেইম খেলতেন। একটা গেইম বারবার খেলতেন। প্রত্যেকটাতেই নিজের হাই স্কোর থাকা লাগবে মাস্ট। তখন তো আর এখনকার মতো উন্নত গেইম ছিলোনা। তিনি আর্কেড গেইম খেলতেন তাই। তার এই উৎসাহ দেখে লোকাল একজন আর্কেড বস খুশি হয়ে তাকে একটি স্পেস ইনভেডার ক্যাবিনেট গিফট করেন। সাতোশি তো মহা খুশি। এরই মাঝে তিনি নিনটেনডোতেও গেইম খেলতেন। শুধু গেইম খেলেই খুশি না তিনি। একবার মজা করে তিনি তার নিনটেন্ডো ফেমিকনটিও স্ক্রু দিয়ে গুতিয়ে গুতিয়ে খুলে ফেলেন। 

পকেমন গেইমস

পকেমন গেইমস

সাতোশি এবার নিজের এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করার কাজে লেগে যান। এতো বছরের অভিজ্ঞতা মানুষের সাথে শেয়ার করতে হবে তো। এখনকার মতো তখন ভিডিওগ্রাফি এতো এভেইলেবল না থাকায় এবং অবশ্যই ইউটিউব না থাকায় তিনি খাতা কলম নিয়েই বসে যান। অনেক শ্রম দিয়ে তিনি অবশেষে বের করেন তার লেখা একটি ম্যাগাজিন ‘গেইম ফ্রিক’। তার এই ম্যাগাজিন গেইমিং কমিউনিটিতে সাড়া ফেলে। তার মধ্যে একজন ছিলো কেন সুকিমোরে। কেন ছবি আঁকতে ভালোবাসতো। সাতোশির ম্যাগাজিন দেখে সে সাতোশির সাথে যোগাযোগ করে। দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সাতোশির লেখা আর অভিজ্ঞতা এবং কেইন এর আকাআকির দক্ষতা দু’টো মিলিয়ে তারা নিয়মিত গেইম ফ্রিক বের করতে থাকেন। ম্যাগাজিনটি এবার আরো বেশি সাড়া ফেলে। এই কাজের মাঝেই একদিন সাতোশির সুযোগ আসলো তার হিরো শিগুরো মিয়ামোতোর সাথে দেখা করার। শিগুরো মিয়ামোতো ডংকি কং, মারিও ব্রাদার্স সহ আরো অনেক ক্লাসিক গেইমের ডিজাইন করেছেন। এরই মাঝে সাতোশির ম্যাগাজিন টিমও আরো বড় হয়। 

কিন্তু ম্যাগাজিন লিখেই সাতোশির মন ভরে না। তার স্বপ্ন আরো বড়। তিনি এবার চিন্তা করেন নিজেই গেইম বানাবেন। আর ডেডিকেটেড টিম আছে যারা কিনা ভিডিও গেইম ভালো বুঝে। আর কেইনের ছবিও সেখানে খুব মানাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হলো গেইম জার্নালিস্ট থেকে গেইম ডেভেলপারে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া। কি গেইম বানাবে চিন্তা করতে করতে একদিন সাতোশি দেখতে কিছু বাচ্চা দুটো ডিভাইস একসাথে তার দিয়ে লাগিয়ে কি যেনো খেলছে। কাছে গিয়ে দেখেন বাজারে নতুন বের হওয়া প্রোডাক্ট, গেইমবয়। এটাতে দুটো ডিভাইস একসাথে তার দিয়ে কানেক্ট করে বন্ধুদের সাথে খেলা যায়। সাতোশির মাথায় হুট করেই আইডিয়া চলে আসলো। তার মনে পড়লো তিনি ছোট থাকতে পোকামাকড় সংগ্রহ করতেন। এমন কোনো গেইম কি বানানো যায়, যেখানে পোকামাকড় সংগ্রহ করতে হবে এবং বন্ধুদের সাথে ব্যাটল করা যাবে। সেখানে থাকবে নিজের একটি পোকামাকড়ের সংগ্রহশালা। গেইমে থাকতে একটি গল্প, সাথে এডভেঞ্চার এবং অ্যাকশন। 

পকেমন খেলায় ব্যস্ত একজন

পকেমন খেলায় ব্যস্ত একজন

তিনি এই আইডিয়া আর টিমের সাথে শেয়ার করলেন। তার নিনটেনডোর সাথে পূর্বে কাজ করার ভালো অভিজ্ঞতা থাকার কারনে তিনি ভাবলেন তারা তার আইডিয়া লুফে নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হলোনা। নিনটেন্ডো তার আইডিয়াকে প্রাণবন্ত কিন্তু ধোয়াসা মনে করলো। তারা এই আইডিয়া বাদ দিতে চাইলেন। কিন্তু শিগুরো মিয়ামোতোর কাছে আইডিয়া চমকপ্রদ এবং নতুন মনে হলো। তিনি বাকি সবাইকে বুঝালেন। সাতোশি একটি স্পন্সর পেয়ে গেলেন। শুরু হলো কাজ। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ঘটলো বিপত্তি। সাতোশির গেইমের আইডিটা ভালো কিন্তু অনেক বেশি জটিল এবং নিনটেন্ডোর মতো ছোটো ডিভাইসের জন্য না। আর এই ছোট জায়গায় চালানোর মতো রিসোর্সও গেইম ফ্রিকের নেই। তাই আস্তে আস্তে কাজে ভাটা পড়লো। সাতোশি দিনরাত এক করে কাজ করতেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। আস্তে আস্তে নিন্টেন্ডো টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলো। গেইম ফ্রিক টিমও ভেঙে পড়তে লাগলো টাকার অভাবে। সাতোশি আর কুলাতে পারছিলেননা। একসময় এই কাজ থামিয়ে অসম্পূর্ণ কাজটিই তুলে রাখলেন। 

মিয়ামোতো কিন্তু হাল ছাড়লেননা। তিনি সাতোশি ও তার টিম গেইম ফ্রিককে আরেকটি সুযোগ দিলেন ছোট গেইমে কাজ করার যা কিনা নিন্টেন্ডোর মতো ডিভাইসের জন্য উপযুক্ত। একসময় গেইম ফ্রিক টিম একটি পাজল গেইম বানালেন যার নাম ‘ইয়োশিস এগ’ বা ‘ইয়োশির ডিম’। গেইমটা বাজারে প্রচুর সাড়া ফেলে। আর সাতোশির হাতে আসে অনেক বড় অংকের অর্থ। এতো বড় অংকের অর্থ দিয়ে সাতোশি কি করবেন সেটা আর দ্বিতীয়বার ভাবা লাগেনা। তিনি তার অসম্পূর্ণ কাজটি বের করলেন। আগের টিম নিয়ে বসে পুরোদমে কাজ শুরু করলেন এবং একসময় বাজারে আসলো ‘পকেট মনস্টার’ নামে গেইম যাকে সবাই একনামে ‘পকেমন’ বলে চেনে। গেইমটি জাপান ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় মাঙ্গা এবং পরবর্তিতে এনিমে। এই আইডিয়া কাজে লাগিয়ে পরে ডিজিমন, ইয়ো গি ওহ এবং বেইবলেটের মতো বিখ্যাত এনিমে বের হয়। বাজারে আসে পকেমন কার্ড যেটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। 

পকেমন

পকেমন

গেইম, মাঙ্গা এবং এনিমে, সব জায়গাতেই আসল চরিত্রের নাম থাকে সাতোশি যেটি কিনা পরবর্তীতে জাপানিজ থেকে ইংরেজি করার সময় করা হয় এশ। এই এনিমে সিরিজ এখনো বের হচ্ছে, গেইমও আরো উন্নতভাবে বের হচ্ছে, এবং জনপ্রিয়তা দিনকেদিন বাড়ছেই। এই গেইমকে অন্য লেভেলে নিয়ে যাওয়া হয় পকেমন গো এর মাধ্যমে যেটি কিনা আপনি জিপিএস ট্রাকার ব্যবহার করে আসল ম্যাপে পকেমন ধরতে পারবেন, পকেবল কিনতে পারবেন পকেস্টপ থেকে, জিমে গিয়ে ব্যাটল করতে পারবেন, বন্ধুদের সাথে ব্যাটল করতে পারবেন। এবং সবচেয়ে বড় আকর্শন, এটি খেলতে আপনাকে বাসা থেকে বের হতে হবে, পরিশ্রম করে খেলতে হবে, হবে আসল এডভেঞ্চার। সাতোশি তাইজিরি হয়তো ভাবতেও পারেননি তার স্বপ্নের কাজ এতোদূর পর্যন্ত যাবে। পকেমন দিনকেদিন আরো উন্নত হচ্ছে, পাচ্ছে নতুন রূপ, তৈরি হচ্ছে নতুন গল্প। আর পকেমন গেইমের নির্মাতা সাতোশি বুড়ো হয়ে গেলেও, তার গেইমের সাতোশি  ১৯৯৬ থেকে এখন পর্যন্ত সেই ১০ বছরের বাচ্চাই রয়েছে। আর ফ্যানদের উৎসাহও সেই ১৯৯৬ থেকে এখনো গেইমের সাতোশির বয়সের মতো চির সবুজই থেকে গেছে। পকেমনের ‘গটা ক্যাচ এম অল’ মটো এখনোও ফ্যানদের মনে জ্বলজ্বল করে। 

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ