ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৪ ১৪২৬   ১৯ সফর ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
২৩

নীল দুনিয়ার আবেদনময়ী মোটা মেয়েটিই এখন আইন তৈরির অনুপ্রেরণা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০১৯  

১৮ বছরের এক কিশোরী। ঝোঁকের বশে প্রেমিকের সঙ্গে কাটানো গোপনীয় মুহূর্তের ভিডিও ধারন করে সে। তা ছিলো গভীর ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ। সে কি ভেবেছিলো কখনো যে, এই ভিডিওটিই তার জীবনের কাল হবে? যার সঙ্গে ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্ক সেই মানুষটিই কি-না এভাবে প্রতারণা করল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যথারীতি সেই কিশোরীরর নগ্ন ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ল...

সেই কিশোরীর নাম অলিম্পিয়। এই ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করে অলিম্পিয়া। ওই ঘটনা তার জীবনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল শুধু তাদের দু’জনের জন্যই। অলিম্পিয়ার বয়ফ্রেন্ডও এই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অলিম্পিয়ার নাম হয়ে যায় ‘আবেদনময়ী মোটা মেয়েটি।’

আট মাস ঘর থেকে বের হননি তিনি। আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। ধীরে ধীরে একসময় সে বুঝতে শুরু করে, এই ঘটনায় সে আসলে দোষী নয়- সে ভুক্তভোগী। এরপর সে অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে যায় এবং সাইবার যৌন হয়রানি বিষয়ে মেক্সিকোর প্রথম আইনের প্রস্তাবটির খসড়া লেখেন যেটি সেখানে ‘অলিম্পিয়া আইন’ নামে পরিচিত। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটি তুলে ধরা হলো-

হোয়্যাটসঅ্যাপে প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে তার ভিডিওটি। যদিও তার প্রেমিক বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। সে দাবি করে ওই ভিডিওটিতে সে ছিল না। গণমাধ্যমও সজাগ। স্থানীয় একটি পত্রিকা তাদের প্রথম পাতায় অলিম্পিয়ার খবর ছাপায়। রাতারাতি ওই পত্রিকার বিক্রি বেড়ে যায়। সংবাদের কারণে তার শরীর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ট্রলসহ বাজে কমেন্টস এবং যৌন প্রস্তাব পেতে থাকে।

অলিম্পিয়া

অলিম্পিয়া

অলিম্পিয়া বলেন, আমি মেক্সিকোর যে অঞ্চল থেকে এসেছি সে অনুসারে তারা আমাক হুয়াউচিনাঙ্গোর মোটা আবেদনময়ী মেয়েটি বলে ডাকা শুরু করে। যখন কাহিনী আরো ছড়িয়ে পড়ে তখন রাজ্যের নামটাও বাদ যায়নি। আমার নাম হয়ে যায় পুয়েবলার আবেদনময়ী মোটা মেয়ে। আমার মনে হতে থাকে জীবনে আর কিছু বাকি নেই। আমি নিজেকে গৃহবন্দী করে ফেলি এবং আট মাস বাইরে যাওয়ার সাহস করিনি। তখন আমার বয়স কম ছিল, আমি জানতাম না আমি কার কাছে সাহায্য পাবো অথবা এই ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে কীভাবে জানাবো। তার ওপর পুরো ব্যাপারটাই ঘটে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়, যেকারণে মনে হতে থাকে যে এই ঘটনা আসলে ঘটেইনি।

১৫ বছরের বেশি বয়সী মেক্সিকোর দুই-তৃতীয়াংশ মেয়ে কোনো না কোনো ধরণের সহিংসতার শিকার হয়। আমি যখন নিজের সিদ্ধান্তেই ভিডিও করেছি তখন নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করবো কীভাবে? তিনবার আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করি। তার মধ্যে একবার আমি একটি ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন এবং ভাগ্যক্রমে এক বন্ধু গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে দেখে নেমে আসে এবং কথা বলে। আমি জানি না সে বুঝেছিল কিনা যে সে আমার জীবন বাঁচিয়েছে।

আমার মা ইন্টারনেট ব্যবহার করতো না, তাই তিনি পুরো ঘটনাটা জানতেন না। আমি ভেবেছিলাম তার জানতে অনেক সময় লাগবে। আমি বলেছিলাম একটি ভিডিও নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে। তবে জানাইনি যে সেটা আমার ভিডিও ছিল। হঠাৎ এক রবিবার আমার পুরো পরিবার যখন একসঙ্গে ঠিক তখনই আমার ১৪ বছর বয়সী ভাই সবার সামনে তার ফোনে আমার ভিডিওটি সবাইকে দেখায়। আমার মা কাদঁতে শুরু করেন।

আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন ছিল সেটি। আমি আমার মায়ের পায়ে আছড়ে পড়ি। তার কাছে ও আমার পুরো পরিবারের কাছে ক্ষমা চাই। তখনই মা আমাকে চমকে দেন। যিনি একটি নৃতাত্বিক গোষ্ঠী থেকে এসেছেন, স্কুল শেষ করেননি এবং লিখতেও পারেন না। তিনি আমার মাথা তুলে ধরে বলেন, আমরা সবাই যৌন সম্পর্কে জড়াই। তোমার বোন, তোমার খালা, আমি সবাই। পার্থক্যটা হলো তারা তোমাকে এটা করতে দেখে ফেলেছে। এর মানে এই নয় যে তুমি খারাপ মানুষ বা অপরাধী।

অলিম্পিয়ার মতে, প্রতিবার আরেকজনের অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি বা ভিডিও যখন আরেকজনকে পাঠানো হয়, সেটি ধর্ষণের মত। আমার ভেঙে পড়া দেখে সবাই আমাকে বুঝাতে শুরু করে। আমার পরিবার বিষয়টি সহজভাবেই নিয়েছিল এবং তারা আমাকে বারবার বুঝাতে থাকে। আমার বাবা বলতেন, তুমি যদি কিছু চুরি করতে বা কাউকে খুন করতে বা এমনকি, একটি কুকুরকেও আঘাত দিতে, তাহলে সেটা খারাপ হতো।

ইন্টারনেটে নারীর সুরক্ষা প্রদানে তিনি অনেক কাঠখর পুড়িয়েছেন

ইন্টারনেটে নারীর সুরক্ষা প্রদানে তিনি অনেক কাঠখর পুড়িয়েছেন

আমার মা ঘরের ফোন এবং ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আমাকে বোঝান যে বাড়িতে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এরপরও অনেক মানুষ আমার বাড়িতে এসে বলার চেষ্টা করে। তারা আমার একটি ভিডিওর কথা শুনেছে। আমি তাদের কাছ থেকেও লুকিয়ে যাই। মানুষের কোনো ধারণাই নেই এ ধরণের ঘটনার কী প্রতিক্রিয়া ভুক্তভোগীর ওপর পড়তে পারে। এর ফলে সব ধরণের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হয়ে যায়।

অলিম্পিয়া যখন জানতে পারেন আরো অনেক নারীই এমন অপরাধের শিকার, তখন তিনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা চিন্তা করেন। এই কারণে বিচার পর্যন্ত যাওয়াটা এত কঠিন। এ ধরণের পোষ্টে প্রতিটি লাইক আগ্রাসনের মত। ভুক্তভোগীর ওপর আরেকটি আঘাত। তারা ভিকটিমের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে না এলেও ধর্ষণ করছে কারণ তারা অনুমতি ছাড়া অন্যজনের গোপন কার্যক্রম দেখছে। এমনই জানালেন অলিম্পিয়া

আমি ভেবেছিলাম যে আমি আর কখনোই বাড়ি থেকে বের হবো না। কিন্তু দুটি জিনিস আমাকে বের হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। প্রথম, যখন আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করে বলে নারীদের তাচ্ছিল্য করে এমন কিছু ওয়েবসাইট দেখতে। সেগুলো দেখার কারণ হিসেবে আমার বন্ধু বলে, যেন তুমি বুঝতে পারো যে তুমি একাই ভুক্তভোগী না। তারা শুধুমাত্র নিজেদের আনন্দের জন্য সবার সাথেই এমন করে। তোমার বাগ্মীতা আছে এবং তুমি এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

অলিম্পিয়া আরো বলেন, আমি সবচেয়ে বেশি বাবরুদ্ধ হই যখন দেখি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক মেয়ের ছবিতে বাজে কমেন্টস। একজন মন্তব্য করে যে, মেয়েটি দেখতে যেমনই হোক না কেন তার সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই যে'এরকম হতে দেয়া যায় না। দ্বিতীয় যে ঘটনা আমার মন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে সেটি হলো আমার ভিডিওর খবর ছাপা পত্রিকাটি যখন আরেক নারীর বিষয়ে খবর ছাপে যে তিনি ৪০ জোড়া জুতা চুরি করেছেন।

বর্তমানে তার দেয়া আইনটি বাস্তবায়ন হচ্ছে

বর্তমানে তার দেয়া আইনটি বাস্তবায়ন হচ্ছে

ঘটনাক্রমে, একদিন আমি যখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম, ওই নারীকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখি। চমৎকার একটি হলুদ পোশাক পড়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি, তাকে দেখতেও ভাল লাগছিল। কিন্তু রাস্তার সবাই তাকে বিদ্রুপ করছিল। এমনকী ফুল বিক্রেতা তাকে দেখে ফুল লুকিয়ে ফেলে, যেন তার সামনে পড়লে ফুলগুলো শুকিয়ে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই মহিলা যদি চুরি করেও রাস্তায় বের হতে পারেন, আমি কেন পারবো না?

দ্বিতীয়বারের মত পরীক্ষা

অলিম্পিয়া যখন জানতে পারেন আরো অনেক নারীই এমন অপরাধের শিকার, তখন তিনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা চিন্তা করেন। দ্বিতীয়বারের মত পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় আমাকে। দায়িত্বরত অফিসার শুরুতেই আমার ভিডিওটি দেখতে চায়। ভিডিও দেখার পর সে হাসিতে ফেটে পড়ে। তার বক্তব্য ছিল, আপনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন না, মাদকের প্রভাবেও ছিলেন না, কেউ আপনাকে ধর্ষণও করেনি। ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, এখানে কোনো অপরাধই হয়নি।

ইন্টারনেটে যারা এরকম হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমন নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করে অলিম্পিয়া। তাদেরকে তিনি আহ্বান করেন এ বিষয়ে একজোট হতে। পুয়েবলা রাজ্যের জন্য আইনের একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে তারা সবাই মিলে। কয়েকবছর আইনটির বিষয়ে প্রচারণা চালানোর পর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। অনেকেই অলিম্পিয়াকে দাবানোর চেষ্টা করেছেন। কোনো লাভ হয়নি।

যদিও সবাই এরই মধ্যে জেনে গেছে অলিম্পিয়া কে এবং তার শরীর দেখতে কেমন? এ বিষয়ে অলিম্পিয়া বলেন, আমি যা করতে যাচ্ছি তা আমাকে বিচার পাইয়ে দেবে না, কারণ আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে তা আর শোধরানোর উপায় নেই। কিন্তু আমি ওইসব মেয়েদের কথা ভেবেছি যারা একই ধরণের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যেসব মেয়েরা আত্মহত্যার কথা ভাবছে, যেমন আমি ভেবেছিলাম। সাইবার যৌন সহিংসতা নিরসনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা প্রস্তাবটি পুয়েবলার মেয়রের সামনে জনসম্মুখে উপস্থাপন করি আমি।

অলিম্পিয়া এখন অন্যান্য নারীদের পথপ্রদর্শক

অলিম্পিয়া এখন অন্যান্য নারীদের পথপ্রদর্শক

সময়টা ছিল ২০১৪ এর মার্চ মাস। অলিম্পিয়ার বয়স তখন ১৯। তার দেয়া বক্তব্যটি তুলে ধরা হল- আমি অলিম্পিয়া। হুয়াউচিনাঙ্গো’র মোটা আবেদনময়ী মেয়েটি। আমি তাদের আমার ভিডিওর কথা বলি। বলি যে আরও এমন অনেক মেয়ে আছে যারা এধরণের অপরাধের ভুক্তভোগী। তাদেরকে আমি স্ক্রিনশট দেখাই যে ওই অনুষ্ঠানের বক্তাদের কয়েকজনও আমার ভিডিওতে লাইক দিয়েছে এবং শেয়ারও করেছে। ‘আপনারা অপরাধী, আমি নই’, তাদের বলি আমি।

যেই ফেসবুক পেইজটি আমার ভিডিও শেয়ার করেছিল, সেটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। তারা জানায় এক উন্মাদ নারীর জন্য তারা পেইজটি বন্ধ করে দিচ্ছে। তখনও বহুদূরের পথ বাকি ছিল। একজন সাংসদ তখন বলেছিলেন, তিনি আমার প্রস্তাব সমর্থন করতে পারবেন না কারণ সেটি বেহায়াপনা অনুমোদন করার শামিল হবে। যদিও প্রস্তাবটি আইনে রূপান্তরিত হয় ২০১৮ সালে। আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত কোনো বিষয় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

২০১১ সালে আইনটি পুয়েবলায় কার্যকর হয় এবং বর্তমানে মেক্সিকোর ৩২টির মধ্যে ১১টি রাজ্যেই এর প্রণয়ন হয়। এই ধরনের অপরাধ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির বিষয়গুলোও জায়গা পায়। কয়েক বছরের আলোচনার পর পুয়েবলা রাজ্যে আইনটি পাস হয়। ইন্টারনেটে নিরাপত্তা চায় নারীরা। আইনের বাস্তবায়নের চেয়েও অলিম্পিয়ারা এই মূল প্রতিপাদ্যটি সম্পর্কে বেশি সচেতনতা প্রকাশ করে। এই ধরনের সহিংসতা রোধ এবং প্রতিকারের লক্ষ্যে সচেতনতা বলয় তৈরি করার চেষ্টা করে। 

একদল নারী মিলে তারা ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর সরোরিটি তৈরি করে। ডিজিটাল সহিংসতা এড়িয়ে চলতে এবং নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে নারীদের ক্ষমতায়নের চেষ্টায় এখনো কাজ করছে অলিম্পিয়া। এক সাংবাদিক তার প্রতিবেদনে আইনটিকে অলিম্পিয়া আইন হিসেবে উল্লেখ করার পর থেকে সবাই ওই নামেই ডাকা শুরু করে। অলিম্পিয়া বললেন, আমি এখন আর মোটা মেয়েটি নয়। সাইবার ক্রাইমের শাস্তির প্রসঙ্গ উঠলেই এখন আমার নামটি উচ্চারিত হয়।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ