ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
৪১

দেখে আসুন ধুপপানি ঝরনা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ নভেম্বর ২০১৯  

এমন কিছু দৃশ্য থাকে, যার সৌন্দর্যে শুধুই ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে সেই অপরূপ সৌন্দর্য গিলে ফেলে হজম করার বৃথা চেষ্টা করি আমরা! বলা হচ্ছে ধুপপানি ঝরনার কথা। অনেকে ‘শ্বেত শুভ্র পানির ঝরনা’ নামেও ডাকেন। ধুপ শব্দের হচ্ছে সাদা আর পানি মানে পানি, অর্থাৎ সাদা পানির ঝরনা। প্রায় ২০০ মিটার উঁচু থেকে যখন পানি নিচে গড়িয়ে পড়ে তখন পানির কণাগুলো অনেকটাই সাদা ফেনার জগত সৃষ্টি করে নিচে।

দেশের সুন্দর ঝরনাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই ‘ধুপপানি ঝরনা’। এই ঝরনার পাদদেশে এমন একটি জায়গা আছে, যা দেখতে অনেকটা গুহার মতো। নিচের গুহায় বসার পর মনে হচ্ছিলো যেন অন্য জগতে অবস্থান করছি। বর্ষায় শুভ্র আকার ধারণ করে পানি ঝাঁপিয়ে পড়ে দানবীয় রূপে। পরিপূর্ণ এক ট্রেকিং এটি। ভয়, ঝুঁকি, শিহরণ, উচ্ছ্বাস, চমক, সৌন্দর্য কী নেই!

সীতাকুন্ড, মীরসরাই কিংবা সিলেট রুট বাদ দিয়ে ভিন্ন কোথাও ভিন্ন ভাবে ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে চান, তবে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো অপশন হতে পারে এটি। মনে একটু সাহস নিয়ে দেখে আসতে পারেন কাপ্তাইয়ের বিলাইছড়ি রুটের ধুপপানি, মুপ্পোছড়া, ন কাটা ছড়া আর গাছকাটা ঝরনা। বাজেটও খুব বেশি লাগবে না। জনপ্রতি চার হাজার নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হয়। তবে হ্যাঁ, বিলাসী টাইপ মানুষের জন্য খরচটা বাড়াতে হবে।

ঢাকার কলাবাগান অথবা সায়দাবাদ থেকে সরাসরি কাপ্তাইয়ের বাস আছে। নন এসি বাসের ভাড়া ৫৫০টাকা। যেদিন রওনা দেবেন, সেদিন রাত দশটার আগে বাসে উঠতে হবে। কারণ এর পরদিন কাপ্তাই থেকে বিলাইছড়ির লোকাল বোট ধরতে হবে। সকাল ৮টা ৩০মিনিটে ছাড়ে প্রথম বোট। এর পরের লোকাল বোট ছাড়ে ১০টা ৩০মিনিটে। আপনি চাইলে বোট রিজার্ভও নিতে পারেন। এক্ষেত্রে ৫৫০০ টাকায় পুরো ট্রিপের জন্য ছাউনি ছাড়া বোট নেয়াই ভালো হবে। এতে খুবই কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। যেতে যেতে দেখতে পাবেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। যদি ভাগ্য বেশি ভালো থাকে তাহলে বৃষ্টি পেয়ে যাবেন, পাটাতনের নিচে ব্যাকপ্যাক রেখে হারিয়ে যেতে পারবেন অন্য এক দুনিয়ায়।

 

ধুপপানি ঝরনা

ধুপপানি ঝরনা

ভোরে কাপ্তাই পৌঁছে সকালের নাস্তা করেই তার পরদিনের রাত ৮টা ৩০ মিনিটের ফিরতি টিকেট করে নেবেন। কারণ কাপ্তাই থেকে ঢাকার শেষ বাস তখনই ছাড়ে। বাস স্ট্যান্ড থেকে সোজা হাঁটলেই কাপ্তাই ঘাট। ৫৫ টাকা ভাড়া মিটিয়ে ঠিক ৮ টা ৩০ মিনিটে উঠে পড়ুন বোটে। প্রায় দুই ঘণ্টার এই বোট জার্নিতে, কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য আপনার রাতের বাস ভ্রমণকে অনেকটাই ভুলিয়ে দেবে।

বিলাইছড়ি পৌঁছানোর পনের মিনিট আগে সেনাবাহিনীর প্রথম চেকপোস্ট পড়বে। সেখানে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। আমরা সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বিলাইছড়ি পৌঁছে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি। ঘাটের কাছের দূরত্বে ভাতঘর হোটেলে থাকাটাই সবচেয়ে ভালো কাজ হবে। যেকোনো সময় লেকের পাড়ে বসতে পারবেন। এই হোটেলের ভাড়া- চার জনের ডাবল বেডের রুম ৫০০ টাকা ও ২ জনের সিঙ্গেল বেডের রুম ৩০০ টাকা।

লোকাল বোটে আসলে বিলাইছড়ি থেকে দু’দিনের জন্য বোট ঠিক করে নেবেন। দু’দিনে ৩টা ঝরনার জন্য বোট ভাড়া ২৫০০ টাকা নেবে। হোটেলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে বোটে উঠে পড়বেন।

রওনা দেয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই মুপ্পোছড়া ট্রেইলের মাথায় (বাঙ্গালকাটা) পৌঁছে যাবেন। মাঝিকে বলে রাখলে মাঝিই গাইড ঠিক করে রাখবে। গাইডের খরচ পড়বে চারশ’ টাকার বা এর কম। প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেকিং-এর পর মুপ্পোছড়া পৌঁছাবেন। পথে ৫/৬ টা ছোট ছোট ঝরনা দেখতে পাবেন। পথে ‘ন কাটা ছড়া’ পড়বে। আসার পথে এখানে আসলে গোসলটাও সেরে নিতে পারবেন। ৩টা ৩০ মিনিটের মধ্যে নৌকায় চলে আসবেন। নৌকা থেকে নেমে আরো প্রায় এক ঘণ্টার মত হাঁটলে আপনি গাছকাটা ঝরনা দেখতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোনো গাইডের প্রয়োজন হবে না, কারণ মাঝিই নিয়ে যাবে। অবশ্যই রিজার্ভ করার সময় সেটা বলে নেবেন। লেকে বসেই সূর্যাস্ত দেখে নেবেন, মুগ্ধ হওয়ার গ্যারান্টি দেয়া যায় নিমিষেই। এভাবেই প্রথম দিনের যাত্রা শেষ করে হোটেল এ ফিরবেন। গোসল করে রাতের খাবার খেয়ে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবেন। কারণ পরের দিন ভোর ৫ টায় উঠতে হবে!

পরদিন সকাল ৬টার মধ্যে নৌকায় চলে যাবেন। এর মধ্যেই সকালের নাস্তা অর্ডার দিয়ে রাখবেন। রাতে অর্ডার দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ ভোরে প্যাকেট করে রেখে দিবে। যাওয়ার সময় ভোরে পর্যাপ্ত পানি নিয়ে নিবেন। প্রায় ২ ঘণ্টা পর উলুছড়ি পৌঁছে যাবেন। পথে আরো দু’বার সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট পড়বে।

 

ধুপপানি ঝরনার গুহা

ধুপপানি ঝরনার গুহা

উলুছড়ি থেকে ছোট ডিঙি নৌকা নিতে হবে। প্রতি নৌকায় (ভাড়া তিনশ’ টাকা) ৭/৮ জন বসতে পারে। সঙ্গে গাইডকে দিতে হবে পাঁচশ’ টাকা। বিশ মিনিটের মত নৌকা জার্নি করে হাঁটা শুরু করতে হবে। পথে ৩ টা পাহাড় পার করতে হবে। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো পথ পাড়ি দিয়ে ধুপপানি পাড়ায় পৌঁছাবেন। এখানে একটা দোকান আছে সেখানে চাইলে হালকা খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

এরপর কখনো ঝিরি পথ, কখনো ধানক্ষেত, কখনোবা একের পর এক জুম পাহাড়ের পথ ধরে ছুটে চলা। গভীর খাদের উপর বৃষ্টিতে পিচ্ছিল গাছের গুঁড়ি কিংবা বাঁশের উপর সাবধানে পা ফেলা। প্রকৃতির বুনো রুপ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সহজ ও সংগ্রামী জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে কেটে যাবে আধা ঘণ্টার হাঁটা পথ। ততক্ষণে আপনি ভীষণ ক্লান্ত। ঠিক ওই মুহূর্তে সবুজের ভেতর থেকে কানে বাজবে ঝিরঝির শব্দ। সর্বশেষ পাহাড়ের উপর থেকে দেখা যাবে সবুজের ভেতর থেকে দুধসাদা পানির ঝরে পড়া। এর এক ঝলক আপনার পুরো জার্নিকেই ভুলিয়ে দেবে। ঝরনার উচ্চতা অনেক বেশি হওয়ায় পানি নিচে নামতে নামতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। চারপাশ মোটামুটি আবদ্ধ থাকায় বাতাসে পানির কণা এতটাই বেশি থাকে যে, আপনি কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বের করতে পারবেন না- যদি না সেটা ওয়াটার প্রুফ হয়।

এখানে ঘণ্টাখানেক গোসল করার সময় পাবেন। ঝরনার একদম নিচে গুহায় অবশ্যই যাবেন। তবে কয়েক জায়গায় প্রায় ৬ ফিট গর্ত আর পানির নিচে এলোমেলো বড় বড় পাথর আছে। ধুপপানি হচ্ছে এক বৌদ্ধ বিক্ষুর তীর্থ স্থান। তাই এখানে এসে চিল্লাপাল্লা ও উচ্চবাচ্য করবেন না। মন টানবে না ফিরে যেতে, তবুও ১১ টার মধ্যে রওনা দিতে হবে। ফেরার পথে ধুপপানি মন্দির দেখে আসবেন। এরপর আপনাকে ধূপপানির মায়া ত্যাগ করে ফিরতে হবে। নয়তো বিলাইছড়ি থেকে ৪ টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া শেষ লোকাল বোট ধরতে পারবেন না। কাপ্তাই এসে সরাসরি ঢাকার বাসেও আসতে পারেন। এছাড়া চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৭০ টাকায় এসে ট্রেনে ঢাকা আসতে পারেন ঢাকা।

জেনে রাখুন

ঢাকা থেকে সরাসরি কাপ্তাই জেটির বাসে উঠবেন। কাপ্তাই জেটিতে নামার পর বিলাইছড়ি যাবেন ট্রলারে। পুরো ট্রলার ভাড়া নিতে পারেন আবার লোকাল ট্রলারেও যেতে পারেন। লোকাল ট্রলার ছাড়ার সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিট, ১০ টা ৩০ মিনিট ও দুপুর ১টা। বিলাইছড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করে নিতে পারেন। সঙ্গে কিছু শুকনো খাবারও নিন। কারণ এখনো পথ বাকি অনেকটা। বিলাইছড়ি থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে যাবেন উলুছড়ি পর্যন্ত। পাহাড়ি ঢলের এই নদী পার হতে সময় লাগবে ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা। উলুছড়ি থেকে গাইড নেবেন। নৌকায় পার হতে হবে আরো কিছু পথ। এরপর হেঁটে পৌছবেন ধুপপানি পাড়া। হাঁটতে হবে ২ ঘণ্টার মতো। ধুপপানি পাড়া থেকে ২০০ মিটার নিচে এই স্বর্গীয় ঝরনার অবস্থান।

বিলাইছড়িতে থাকার জন্য কটেজ আছে। স্বল্প ভাড়ায় থাকা-খাওয়া উভয়ের ব্যবস্থাই হয়ে যাবে। মনে রাখবেন ঝরনাটি অনেক গহীন এলাকায়। তাই অবশ্যই গাইড ছাড়া যাবেন না। ট্রাকিং এর উপযোগী ভালো জুতা নিন। ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক গ্রহণ করুন যাওয়ার আগে থেকে। আপনার সঙ্গে জরুরি অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রটি অবশ্যই রাখবেন।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ