ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৪ ১৪২৬   ১৯ সফর ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
৭০৬

দুধ সম্পর্কীয় ভাই-বোনদের বিয়ে ও এ সংক্রান্ত বিধিবিধান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

সমাজে অনেক মহিলা আছেন, যারা নিজের সন্তানের সঙ্গে অন্য কারো সন্তানকে সাময়িক বা দুধ পানের পুরো সময়টাই দুধ পান করিয়ে থাকেন। 

আমাদের সমাজে এটি কোনো পেশা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিছক দায়বদ্ধতা থেকে মহিলারা এ কাজ করেন। যেমন কোনো সন্তানের মা মারা গেলো বা কোনো কারণে মায়ের স্তনের দুধ শুকিয়ে গেলো ইত্যাদি কারণে দুধ পান করিয়ে থাকেন। আবার শখের বশবর্তী হয়েও মহিলারা এ কাজ করতে পারেন। 

কোনো কোনো জায়গায় এটি মহিলাদের পেশা। তারা এর দ্বারা অর্থ উপার্জন করেন। দুধ পান যে সুরতেই করানো হোক, ইসলাম তার বৈধতা দিয়েছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু আফসোস! দীনের শিক্ষা থেকে দূরে সরে আসার কারণে এ সম্পর্কে আমরা অনেকে অজ্ঞ। এ জন্য সামাজিক নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। যেমন কোথাও দুধ সম্পর্কীয় ভাই তার দুধ সম্পর্কীয় বোনকে বিবাহ করে ফেলছে। তাই এখানে দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা ও অন্যান্য বিধিবিধানের আলোচনা তুলে ধরা হচ্ছে। আরবি ভাষায় এ রকম দুধ পান করানোকে ‘রিযাআত’ বলা হয়। তাই কখনো রিযাআত শব্দের ব্যবহার হতে পারে এতে অস্পষ্টতার কিছু নেই।
 
শরয়ী পরিভাষায় রিযাআত বা দুধ পান কাকে বলে? 
রিযাআতের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, দুধ পান করানো। শরয়ী পরিভাষায় ‘রিযাআত’ বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে, মা ভিন্ন অন্য কোনো মহিলার দুধ পান করা। (আত তারিফাত লিজ জুরজানী-১১১) কেউ কেউ বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য এভাবে পরিচয় দিয়েছেন যে, একজন মহিলা অপর একজন পুরুষের জন্য যে সকল কারণে চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়, এ রকম একটি কারণ হচ্ছে রিযাআত বা দুধ পান। (কামুসূল ফিকহ, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৪৮৪)

কতটুকু পরিমাণ দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে? 
কতটুকু পরিমাণ দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে এ ব্যাপারে ফকিহগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। নিম্নে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

(এক) ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর মত হচ্ছে, সামান্য পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। এখানে কম বেশি ধর্তব্য নয়। কম থেকে কম, যেমন এতটুকু পান করলো যা কোনোভাবে পেট পর্যন্ত পৌছতে পারে, তা দ্বারাই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যাবে। তার দলীল হচ্ছে, কোরআন ও হাদিসের যেখানেই দুধ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিষয়টিকে ব্যাপক রাখা হয়েছে; কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের কথা উল্লেখ করা হয় নাই। মালেকী মাজহাবের মতও হানাফী মাজহাবের ন্যায়।

(দুই) এর বিপরীত অধিকাংশ ফকিহগণের মত হচ্ছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ দুধ পান করা ছাড়া দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। নির্দিষ্ট পরিমাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাঁচবার পরিতৃপ্তির সঙ্গে শিশুর দুধ পান করতে হবে। দুধ পান করতে করতে যখন স্বেচ্ছায় দুধ পান থেকে বিরত থাকবে, বুঝা যাবে সে তৃপ্ত হয়েছে। এভাবে পাঁচবার পান করার দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। তাদের দলীল হচ্ছে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণীত হাদীস। তিনি বলেন, কোরআনে প্রথম দশবার পান করার দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার হুকুম নাযিল হয়েছিলো। তারপর সেই হুকুম পরিবর্তন করে পাঁচবারে আনা হয়েছে। (ফাতহুল বারী শরহু সহীহিল বোখারী, ৯/১৪৭)

কোন বয়সে দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে:
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে শিশুর বয়সের ব্যাপারে ফকিহগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। 

(এক) ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর মত হচ্ছে, শিশুর বয়স আড়াই বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত দুধ পান দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। আড়াই বছরের উর্ধ্বে কোনো শিশু দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না।
 
(দুই) ইমাম মালেক, শাফেয়ী ও হানাফী মাজহাবের ইমাম আবু ইউসূফ ও মুহাম্মাদ (রাহ.) প্রমুখের মত হচ্ছে, দুই বছরের আগ পর্যন্ত দুধ পান দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। এর উর্ধ্বের কোনো শিশু দুধ পান দ্বারা দুধ সম্পর্ক স্থাপন হবে না। প্রত্যেকেই স্বপক্ষে কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। আয়াতের সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বিতীয় মতটিকে সমর্থন করায় পরবর্তী ফকিহগণ এ মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
  
(তিন) যেকোনো বয়সী মানুষের দুধ পান করার দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যাবে। হজরত আয়েশা (রা.) এই মত পোষণ করতেন। তবে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘বাদায়ে’-তে বলা হয়েছে, তিনি এই মত থেকে ফিরে এসেছিলেন। 

শিশুকে দুধ পানের সর্বোচ্ছ সীমা যেহেতু দুই বছর তাই দুই বছরের পর শিশুকে দুধ পান করানো জায়েজ হবে না। তবে বিশেষ কারণে দুধ পান করানো যেতে পারে। এবং এই সীমার বাইরে কেউ দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। তাই স্বামী যদি স্ত্রীর স্তন চোষে এবং দুধ ভিতরে চলে যায় তাহলে স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হবে না। তবে স্বামী গোনাহগার হবে।
 
কোন দিক দিয়ে দুধ পেটে পৌঁছলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে:
শিশু স্তন থেকে পান করলে বা করালে যেমন দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়, তেমনিভাবে বাচ্চার মুখে বা গলায় দুধ ঢেলে দিলে বা নাক দিয়ে দুধ ভিতরে পৌছে গেলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। কান বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে দুধ ভেতরে গেলে সম্পর্ক স্থাপন হবে না।
 
কোনো বস্তুর সঙ্গে মিশিয়ে দুধ খাওয়ালে:
শুধু দুধ পান না করিয়ে বরং কোনো কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হলে, হুকুম নিম্নরূপ হবে-

(এক) যে খাবারের সঙ্গে দুধ মিলানো হয়েছে তা  যদি তরল না হয় তাহলে দুধের পরিমাণ বেশি হলেও সম্পর্ক স্থাপন হবে না। চাই দুধ দ্বারা ওই বস্তু পাকানো হোক বা না।

(দুই) তরল বস্তুর সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়ানো হলে আধিক্যের ভিত্তিতে হুকুম হবে। অর্থাৎ দুধের পরিমাণ বেশি হলে, দুধ সম্পর্ক স্থাপন হবে, অন্যথায় নয়। কোনো পানীয়ের সঙ্গে মিলালেও একই হুকুম।

(তিন) দুই মহিলার দুধ একসঙ্গে মিলিয়ে পান করানো হলে উভয় মহিলার সঙ্গে দুধ সম্পর্ক স্থাপন হবে, কম বেশি ধর্তব্য হবে না। এটাই সহীহ মত।

দুধ সম্পর্কীয় যে সকল আত্মীয়স্বজন হারাম: 
রাসূল (সা.) বলেন, বংশীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে যারা হারাম, দুধ সম্পর্কের ভিত্তিতে তারাই হারাম। (বোখারী, ৭/১৫) ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মীয়তার সম্পর্ক তিন কারণে হয়। বংশ, বিবাহ ও দুধ পান। অতএব, আত্মীয়স্বজনের মাঝে এমন কিছু আছেন; বংশীয় কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম। যেমন সন্তানের জন্য পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী ও এভাবে তাদের উপরের যারা আছেন এবং  পিতা-মাতার জন্য সন্তান, সন্তানের সন্তান এভাবে নিচের দিকে যারা আছেন তাদের বিবাহ করা হারাম। 

ভাগ্নে বা ভাতিজার জন্য খালা বা ফুফকে বিবাহ করা এবং মামা বা চাচার জন্য ভাগ্নি বা ভাতিজিকে বিবাহ করাও বংশীয় কারণে হারাম। কিছু আত্মীয়স্বজন আছেন এমন, বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম। যেমন শাশুড়ি, স্ত্রীর আগের স্বামীর মেয়ে। বংশগত কারণে যারা হারাম দুধ সম্পর্কের কারণেও তারা হারাম। অর্থাৎ দুধ সন্তান তার দুধ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী এরূপ উপরের আত্মীয়দের জন্য হারাম। 

এ রকম দুধ পিতা-মাতার জন্য দুধ সন্তান, সন্তানের সন্তান এভাবে নিচের দিকের আত্মীয়রা হারাম। নিজের মেয়ের জামাতার ন্যায় দুধ মেয়ের জামাতাও শাশুড়ির জন্য হারাম। বিস্তারিত আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

দুধ সম্পর্ক প্রমাণের জন্য শর্ত:
দুধ সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের জন্য হারাম হওয়া বিষয়টি দুভাবে প্রমাণীত হতে পারে।
 
(এক) স্বীকার করে নেয়া। যেমন স্বামী স্বীকার করে নিলো যে, আমরা দুজন ওমুক মহিলার দুধ পান করেছিলাম। অতএব, আমাদের মাঝে বিবাহ সহিহ হয়নি।

(দুই) সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা। অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় এখানেও দুজন পুরুষ কিংবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলার সাক্ষ্য দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে এবং এর ভিত্তিতে বৈবাহিক সম্পর্ক অবৈধ হবে। এর চেয়ে কম সাক্ষী দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। কেননা এ ব্যাপারে হজরত ওমর (রা.) এর সিদ্ধান্ত বর্ণিত আছে। তবে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য দেয় যে, এই স্বামী-স্ত্রী একই মহিলার দুধ পান করেছিলো তাহলে সতর্কতা হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্ক খতম করে দেয়া। 

হজরত উকবা ইবনে হারেছ আবু ইহাবের মেয়েকে বিবাহ করেন। পরবর্তীতে এক মহিলা এসে সংবাদ দেয় যে, তারা দুজন ওই মহিলার দুধ পান করেছিলো। উকবা (রা.) বিষয়টি মানার ব্যাপারে প্রস্তুত ছিলেন না। তারপরও রাসূল (সা.) ওই সাহাবিকে নির্দেশ দিলেন স্ত্রীকে ত্যাগ করার জন্য। এই বর্ণনার ভিত্তিতে ইমাম মালেক (রাহ.) বলেন, দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার জন্য একজন মহিলার সাক্ষ্যই যথেষ্ঠ। ইমাম শাফয়ী (রাহ.) মত হচ্ছে, চারজন মহিলার সাক্ষ্য দ্বারাও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হতে পারে। যদি শরয়ী দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণ হয়, স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের দুধ ভাই বোন তাহলে একসঙ্গে থাকা বৈধ হবে না।

দুধ ব্যাংক ইসলাম কী বলে: 
পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো দেশে দুধ ব্যাংকের প্রচলন শুরু হয়েছে। মহিলারা এখানে দুধ জমা করে এবং বাচ্চাদের জন্য এই দুধ বিক্রি করা হয়। সকল ফকিহগণ একমত যে, এ রকম ব্যাংক তৈরি করা বৈধ নয়। ও, আই, সি এর ফিকাহ বোর্ড ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ থেকে এ ব্যাপারে নিষিদ্ধের ফতোয়া দেয়া হয়েছে। 

ফতোয়াটি হচ্ছে, ‘ ইসলাম দুধ সম্পর্ককে বংশীয় সম্পর্কের ন্যায় মনে করে। ইজমায়ে উম্মত হচ্ছে, বংশীয় কারণে যারা হারাম, দুধ সম্পর্কের কারণেও তারা হারাম। ইসলামী শরীয়তের অন্যতম মাকসাদ হচ্ছে এ রকম আত্মীয়তার সম্পর্ককে হেফাজত করা। দুধ ব্যাংক আত্মীয়তার সম্পকর্কে তালগোল পাকিয়ে দিবে তাই সিদ্ধান্ত হচ্ছে-

(এক) মুসলিম বিশ্বে এ রকম দুধ ব্যাংক তৈরি করা নিষিদ্ধ।

(দুই) দুধ ব্যাংক দ্বারা দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ
এই বিভাগের আরো খবর