ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৫ ১৪২৬   ২১ মুহররম ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ

জ্যাক মা’র বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান জ্যাক মা নিজের ৫৫তম জন্মদিনে অবসরে গেলেন। পৃথিবীজুড়ে মানুষ তাকে চেনে তার অটল সংকল্পের কারণে। বারবার ব্যর্থতা আর প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি, অসম্ভব সব প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে পৌঁছেছেন সাফল্যের শিখরে।

জ্যাক মা এর উত্থান অনেকটা গল্পের নায়কের মতই। চীনের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ১৯৬৪ সালে পশ্চিম চীনের হোয়াং ঝু প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার এক বড় ভাই এবং ছোট বোন ছিল। জ্যাক মা যে সময়টায় বেড়ে উঠেছিলেন সে সময়ে চীনে কম্যুনিজমের দাপট ছিল। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল না। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও খুব ভাল ছিল না। জ্যাক মা ছোটবেলা থেকেই ছোটখাটো ছিল এবং স্কুলে তার সহপাঠীদের সঙ্গে প্রায়ই তিনি মারামারিতে জড়িয়ে পড়তেন।

১৯৭৬ সালে মা এর বয়স ১২ বছর। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফরকালে হুয়াং ঝু ভ্রমণ করেন। এর ফলে ভ্রমণকারীদের কাছে হুয়াং ঝু খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন মা প্রতিদিন ভোরে উঠে হেঁটে নতুবা সাইকেলে করে হুয়াং ঝুর প্রধান প্রধান হোটেলে চলে যেতেন বিদেশী ভ্রমণকারীদের কাছে। সে গাইড হিসেবে কাজ করতেন শুধু মাত্র ইংরেজি ভাষা চর্চা করার জন্য। এভাবে দীর্ঘ নয় বছর ধরে জ্যাক মা ফ্রি ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করেন এবং অনেকের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এরকম একটি বিদেশী পরিবারের সঙ্গে তার সখ্যতা হয় এবং পরে তাদের আমন্ত্রণে তিনি অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেন।

ছাত্র হিসেবে জ্যাক মা মোটেও ভাল ছিলেন না। কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় তিনি দু’বার ফেল করেন। তৃতীয়বার পাস করার পরে তিনি হুয়াংঝু টিচার্স ইন্সটিট্যুটে ভর্তি হবার সুযোগ পান। তার ভাষায় এটি ছিল হুয়াং ঝুর সবচেয়ে নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। যাই হোক, ১৯৮৮ সালে তিনি গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন সেখান থেকে। কলেজে পড়া অবস্থায় ঝাং ইং এর সঙ্গে তার পরিচয়। পরবর্তীতে পাস করে তারা বিয়ে করেন। গ্রাজুয়েশনের পরে তিনি বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর চেষ্টা করেন। স্থানীয় কেএফসি, হোটেল এবং পুলিশে চাকরির আবেদন করেন এবং সব জায়গায় ব্যর্থ হন তিনি। পরে একটি স্থানীয় কলেজে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। তখন তার মাসিক বেতন ছিল ১৫ ডলার। সেখানে তিনি পাঁচ বছর চাকরী করেন।

কিছু দিন পর মা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি ব্যবসা করবেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি একটি অনুবাদ প্রতিষ্ঠান চালু করেন। কিন্তু তাতে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলো না। তখনো তিনি টাকার জন্যে রাস্তায় মাল টানাটানি করতেন। ১৯৯৫ সালে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের অনুবাদক হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করার সুযোগ পান। এ ভ্রমণে তার সবচেয়ে লাভ হয়েছিল তিনি ইন্টারনেট সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রথমবার ইন্টারনেট এ তিনি বিয়ার লিখা সার্চ করেন। কিন্তু ইন্টারনেটে কোনো চাইনিজ বিয়ার কেনার ব্যবস্থা দেখতে পেলেন না। মা এর মাথায় চমৎকার ব্যবসার বুদ্ধি আসলো। কী সেটা জানেন?

 

পড়াতে ভালোবাসেন জ্যাক মা

পড়াতে ভালোবাসেন জ্যাক মা

চীনে ফিরে এসে তিনি একটি লিস্টিং সাইট চালু করলেন। পরে তিনি এটি সরকারের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর তিনি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি ইন্টারনেট  প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যান। চাকরি শেষ করে তিনি হুয়াং ঝুতে ফিরে এসে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে নেমে পড়েন। জ্যাক তার বন্ধুদের কাছ থেকে ৬০ হাজার ডলার ধার নিয়ে ‘আলিবাবা ডট কম’ নামে প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। চীনের রপ্তানিকারকরা তাদের পণ্যের তালিকা দিতে পারবে সেখানে এবং বিদেশী ক্রেতারা এসব রপ্তানিকারকদের কাছে থেকে সেই সব পণ্য ক্রয় করতে পারবে।

চীনের অর্থনীতিতে তখন এক বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়ে গিয়েছে। এ সময়ে ইন্টারনেট চীনে পরিচিতি লাভ করা শুরু করে। বেইজিং এর ইউনিভার্সিটি অভ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যাণ্ড ইকনোমিক্স এর চায়না রিসার্চ সেন্টার ফর ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এর পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফেং পেংচেং এর ভাষ্যমতে, সে সময়ে চীনে ক্ষুদ্র ও মাঝারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ যোগাড় করা ছিল কষ্টকর এবং তাদেরকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হতো। আলিবাবা এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে বিশাল আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। খুব তাড়াতাড়ি আলিবাবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে আলিবাবা গোল্ডম্যান স্যাক্স থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার এবং সফটব্যাঙ্ক থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পায়। জ্যাক মা তার প্রতিষ্ঠান নিয়ে শুরু থেকেই খুবই আশাবাদী ছিলেন এবং সফলতাও পান।

২০০৫ সালে ইয়াহু আলিবাবা ডট কমে ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ৪০ শতাংশ স্টেইক কিনে নেয়। এটা ছিল আলিবাবার জন্যে বিশাল অর্জন। চীনের বাজারে আলিবাবার সাথে তখন e-Bay এর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এ বিনিয়োগের ফলে আলিবাবা ও ইয়াহু দুজনেই লাভবান হয়। ২০১৩ সালে মা আলিবাবার সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান তবে নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আলিবাবার IPO (Initial public offering) ছাড়া হয় এবং পরের গল্পটা শুধুই ইতিহাস। আলিবাবার এ ঐতিহাসিক সাফল্যে যুক্তরাষ্ট্রের  সিএনবিসি চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকারে জ্যাক মা বলেন, ‘আজ আমরা মানুষের টাকা নয় তাদের বিশ্বাস অর্জন করেছি।’

আলিবাবার সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ জ্যাক মা’র ব্যক্তিত্ব। তিনি মেধাবী ও পরিশ্রমী ব্যক্তিদের পছন্দ করতেন এবং তাদের সাহায্য করতেন। তার প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং তার আচরণ অনেক মেধাবীকে আকৃষ্ট করে। জ্যাক মা আলিবাবার অফিসে সবসময়ে একটা হাল্কা পরিবেশ তৈরি করে রাখতেন। আলিবাবা প্রথমবার লাভের মুখ দেখার পরে তিনি সব কর্মচারীদেরকে একটা করে সিলি স্ট্রিং এর স্প্রে ক্যান উপহার দেন। কাজে যাতে উৎসাহ আসে সেজন্য জ্যাক মা তার কর্মচারীদের নিয়ে নানা ব্যায়াম করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে আলিবাবার সাফল্য জ্যাক মা এর সম্পত্তির পরিমাণ আরো বাড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনে প্রাচুর্যের জৌলুস নেই। মা এর প্রিয় শখ কুংফু ফিকশন পড়া, পোকার খেলা এবং তাই-চি (এক ধরণের মার্শাল আর্ট) চর্চা করা। তিনি চীনের জনপ্রিয় অভিনেতা জেট লি এর সঙ্গে মিলে তাই-চি’কে প্রমোট করেন । তিনি যেখানেই যান না কেন তার সঙ্গে সব সময় একজন তাই-চি প্রশিক্ষক নিয়ে যান। বর্তমানে মিডিয়ার যুগে জ্যাক মা এর মতো ধনী ব্যক্তিরা সব সময়ে মিডিয়াতে আসেন। কিন্তু জ্যাক মা’র পারিবারিক জীবন মিডিয়াতে সেভাবে আসেনি। তার ব্যক্তিগত কোনো স্ক্যান্ডাল নেই। তার স্ত্রী ঝাং ইং, এক ছেলে, এবং এক মেয়ে নিয়ে জ্যাক মা সুখেই আছেন। তার ছেলে বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অভ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে’র ছাত্র।

জ্যাক মার মতো সফল উদ্যোক্তা হতে কি যোগ্যতা প্রয়োজন তা অনুধাবন করা যায়, তার লেখা একটি চিঠি থেকে। চিঠিটি জ্যাম মা লিখেছিলেন তার কর্মীদের উদ্দেশ্য করে। তিনি চিঠিটিতে উল্লেখ করেন- কঠোর পরিশ্রম কিংবা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার কারণে আমরা সফল হইনি। আমরা পেরেছি গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশ গুরুত্ব দেয়ার কারণে। আর আমরা নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যকে সম্মান জানাতে পেরেছি। আমরা বিশ্বাস করেছি যে, সাধারণ মানুষই অসাধারণ নানা কাজ করতে পারে।

জ্যাক মা’র এই সফলতার গল্প অনেক তরুণকে উৎসাহিত করে। সাধারণ মানুষই অসাধারণ নানা কাজ করতে পারে, শুধু হতে হয় উদ্যোমি।

আজকের ময়মনসিংহ
আজকের ময়মনসিংহ
এই বিভাগের আরো খবর