ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিববঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৫ ১৪২৭

  • || ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

আজকের ময়মনসিংহ
২৮৬

করোনার মতোই ছোঁয়াচে পাঁচ রোগ, প্রাণ কেড়েছে কোটি মানুষের!

আজকের ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২০  

মানব সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে সংক্রমক ব্যাধিরও। বিভিন্ন সময় এসব রোগব্যাধি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে এক স্থান থেকে অন্যত্র। একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি প্রাণীদের পোষ মানিয়ে একই ছাদের তলে বসবাসের কারণে দিনে দিনে ভাইরাসঘটিত রোগ বেড়েছে। এছাড়াও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে মহামারি পর্যায়ের রোগ-ব্যাধি বিভিন্ন রুটের মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। 

বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুসারে, করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল ছিল চীন। সেখান থেকেই একজন, দুইজন করে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা দেশে। মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে করোনাভাইরাসকে। এতে আক্রান্ত রোগী যেমন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছে আবার মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েছে অনেকেই। মৃত্যুর মিছিল দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। এর শেষ কবে? এখনো এর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। এ কারণেই বিশ্ববাসী চিন্তার সাগরে ডুবে রয়েছে। 

বিশ্বে এবারই প্রথম কোভিড-১৯ হানা দিলেও অতীতে এমন অনেক মহামারিই প্রাণ কেড়েছে বিশ্ববাসীর। তেমনি ছোঁয়াচে পাঁচটি রোগ সম্পর্কে আজকে আলোচনা করা হবে। জেনে নিন বিশ্ববাসী কীভাবে সেসব মারাত্মক পর্যায়ের মহামারি কাটিয়ে উঠেছে? অতীতের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সবকিছুরই শেষ আছে। তাই উদ্বিগ্ন না হয়ে বরং বর্তমান পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। সাহসিকতার সঙ্গে সব পরিবেশেই মানিয়ে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে এমন দূর্যোগ এবারই প্রথম নয় এর আগেও বিশ্ববাসীকে আঘাত হেনেছে। তবুও বিশ্ব আজ ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

প্লেগ রোগে আক্রান্তরা

প্লেগ রোগে আক্রান্তরা

১. প্লেগ রোগ, মারা যাওয়ার মতো আর কেউই ছিল না!

‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ নামক ব্যাকটেরিয়াটিই প্লেগ রোগের জন্য দায়ী ছিল। রেকর্ড করা ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারিগুলোর মধ্যে তিনটিই ভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটেছিল। ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস নামক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে প্রাণ গিয়েছিল অন্তত ৫০ মিলিয়ন মানুষের। জাস্টিনিয়ার মহামারিটি ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে প্রথমে পৌঁছায়। প্লেগ রোগটি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল খাদ্যশষ্য। 

এক ধরনের কালো ইঁদুরের শরীরেই নির্দিষ্ট ওই প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া বাস করত। আর এসব ইঁদুর যখন ফসলি জমিতে থাকা খাদ্যশস্যের সংস্পর্ষে আসত তখনই তাতে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাধত। তৎকালীন সময় পৃথিবীতে মিশরই ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যশস্যে জোগানের একমাত্র উৎস। জাহাজের মাধ্যমে মিশরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেত খাদ্যশস্য। আর এ কারণেই সংক্রমণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে আঘাত হানত। এই মহামারির ফলে রোমান সাম্রাজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছিল। 

পাশাপাশি পুরো ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং আরব জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষেই মারা যায় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে। ইতিহাসবিদের মতে, মহামারীর চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার মানুষ মারা যেত! প্রায় ৫০ বছর ধরে বিশ্বে টিকে ছিল এই মহামারি রোগটি। এতে বিশ্বব্যাপী আড়াই কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। তবে কিছু কিছু উৎসে সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও ঠেকেছে। প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক এ মহামারীই ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল। তখন এই রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল না। 

 

ব্ল্যাক ডেথ

ব্ল্যাক ডেথ

২. ব্ল্যাক ডেথ, কোয়ারেন্টাইনের উৎপত্তি

১৪ শতাব্দীতে ইউরোপে দেখা দিয়েছিল ব্ল্যাক ডেথ। সে সময় সারা বিশ্বে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ এ ভাইরাসে মারা গিয়েছিল। সময়টা ছিল ১৩৪৭ থেকে ১৩৪৮। এ সময়টাতেই ব্ল্যাক ডেথ  ইউরোপকে প্রায় বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল। ধারণা করা হয়, এই মহামারিতে ২০০ মিলিয়ন মানুষের জীবন গিয়েছিল। এই মহামারীতে মৃত্যুর হার এতই ছিল যে, অনেকে এটিকে ‘ম্যাগনা মরটালিটাস’ বলে অভিহিত করেন। 

একজন পর্যবেক্ষক বলেছিলেন, জীবিত মানুষের চেয়ে তখন মৃতদেহের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। এ কারণেই মৃতদের কবর বা সৎকারের জন্য তেমন সুস্থ মানুষও ছিল না। ‘ব্ল্যাক ডেথ’ ঠেকাতে এরপর ব্যবস্থা করা হয় কোয়ারেন্টাইনের। প্রথমে, নাবিকদেরকে এক মাসের জন্য বন্দরেই জাহাজের মধ্যে রাখা হত। অতঃপর মার্কিনরা আক্রন্ত সন্দেহভাজনদেরকে ৪০ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখা শুরু করে। 

এই পদ্ধতিটি পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশও অনুসরণ করে। ধারণা করা হয়, প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ ইঁদুর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল ব্ল্যাক ডেথ। যদিও অধ্যাপক স্যামুয়েল কোহনের মতে, সে সময়কার কোনো পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছিলেন ইঁদুরের মাধ্যমে এর আগে এমন কোনো ভাইরাস এর আগে ছড়ায়নি।

 

লন্ডনের প্লেগ

লন্ডনের প্লেগ

৩. লন্ডনের প্লেগ, অসুস্থকে সিল মারা হয়েছিল

ব্ল্যাক ডেথের পরেই লন্ডনে শুরু হয় প্লেগের প্রাদুর্ভাব। ১৩৮৪ থেকে ১৬৬৫ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৩০০ বছরে এই মহামারিটি প্রতি ২০ বছর অন্তর প্রভাব বিস্তার করে। প্রতিবারই নতুন আঙ্গিকে প্লেগ রোগটি মহামারি আকারে পৌঁছে নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে প্রাণ কড়েছে। ১৫০০ দশকের গোড়ার দিকে, ইংল্যান্ড অসুস্থদের আলাদা এবং পৃথকীকরণের জন্য প্রথম আইন প্রয়োগ করে। প্লেগে আক্রান্ত বাড়িগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। 

মানুষের পাশাপাশি লক্ষাধিক বিড়াল ও কুকুরও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ১৬৬৫ সাল অব্দি এই মহামারিটি ছিল শতাব্দীকালীন দীর্ঘ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এক রোগ। মাত্র সাত মাসে এক লাখ লন্ডনবাসী এর প্রভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসময় জনমাগম বন্ধ করা হয়। এমনকি রোগের বিস্তার রোধে ক্ষতিগ্রস্থদের জোর করে বাড়িতে বন্ধ করে তালাবন্ধ করা হয়েছিল। 

 

স্মলপক্সের প্রতিষেধক তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন

স্মলপক্সের প্রতিষেধক তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন

৪. স্মলপক্স, ইউরোপ থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে

গুটিবসন্ত কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া ও আরব এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত এই রোগটি দশজনের মধ্যে তিনজনের প্রাণ কেড়েছিল। ১৫ শতাব্দীর দিকেই প্রথম ইউরোপীয় পর্যটকদের মাধ্যমে স্কলপক্সের ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। আধুনিক কালের মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসীরা মারাত্মকভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়। গুটিজনিত এই রোগের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও ছিল নগণ্য। দশ লক্ষাধিক মানুষের জীবন কেড়েছিল এই গুটিবসন্ত।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, অ্যাডওয়ার্ড জেনার নামে একজন ব্রিটিশ ডাক্তার আবিষ্কার করেন এক ওষুধ। গরুর শরীরে থাকা কাউপক্সের জীবাণু দুধের মাধ্যমে মিশিয়ে খেলেই এই রোগ থেকে মুক্তি মিলবে বলে জানান তিনি। নয় বছর বয়সী এক শিশুর শরীরে এই ওষুধের প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি সাফাল্য পান। পরবর্তীতে এর মাধ্যমেই গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব দমন করা সম্ভব হয়। ১৯৮০ সালের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্তৃক জানানো হয়, স্মলপক্সের ভাইরাসটি বিশ্ব থেকে একেবারেই মুছে গেছে।

 

কলেরার প্রাদুর্ভাব

কলেরার প্রাদুর্ভাব

৫. কলেরা 

১৯ শতকের গোড়ার দিকে কলেরা ইংল্যান্ডব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বানুসারে, এই রোগটি ‘মিয়াসমা’ নামে পরিচিত। যা বাতাসের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ ডাক্তার সন্দেহ করেছিলেন, লন্ডনের পানিতে লুকিয়ে ছিল রহস্যজনক এই রোগটি। পানির দূষণের কারণেই মূলত কলেরা রোগটি তখন মহামারি আকার ধারণা করেছিল। ১৮১৭ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব ভারত বারবার আক্রান্ত হয়েছে কলেরায়। কখনো তীব্র, কখনো মাঝারি রোগের প্রকোপ হিসেবে রোগটি বিবেচনা করা হয়। 

পূর্ব ভারত থেকে তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং সেখান থেকে সুদূর পশ্চিম এশিয়ায়, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলেও। গত ২০০ বছরে মোট সাতবার কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে ভারতসহ গোটা বিশ্ব। ১৮১৭ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কলেরা-অতিমারিতে ভারতে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় কোটির বেশি মানুষ। ১৮৬৫ থেকে ১৯১৭ অবধি এই পরিসংখ্যান ছিল দুই কোটি ৩০ লাখ। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলেরার অতিমারি প্রথম দেখা গিয়েছিল তৎকালীন কলকাতায়।

একে বলা হয় ‘ফার্স্ট এশিয়াটিক কলেরা প্যান্ডেমিক’ বা ‘এশিয়াটিক কলেরা’। চিকিৎসাশাস্ত্রের গবেষকদের ধারণা, কুম্ভমেলা পরবর্তী সময়ে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল উচ্চ গাঙ্গেয় বদ্বীপ থেকে। তারপর সেই রোগ ব্রিটিশ সৈন্য, নৌবাহিনী ও বাণিজ্যতরীর মাধ্যমে পৌঁছে গিয়েছিল অন্যান্য মহাদেশে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে কলেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্মূল হয়ে গেলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব রয়েই গেছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে এখনো বিশ্বের অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মুত্যুবরণ করে।

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ইত্যাদি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর